Skip to main content
ম্যাগাজিনঃ ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বার্তা
ইসলামী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বার্তা
দ্য সেন্টার ফর প্যান ইসলামিক সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিক্যাল রিসার্চ
August 13, 2021
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
দ্য সেন্টার ফর প্যান ইসলামিক সায়েন্স এন্ড টেক রিসার্চ
The Centre For Pan Islamic Science & Tech Research
(A Sister Organization of Islamic Research for Reviving Science & Tech Center)
web:https://cpistr1440.blogspot.com
North Mugultooly by Lane
P.O. Bandar, P.S: Sadarghat
Post Code: 4100, Chattogram(Chittagong)
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি :
আপডেট, তাং-১২-১১-১৯, সময়ঃ সন্ধ্যা ৭টাঃ১৫ মিঃ
গবেষণা এবং আল কুরআন
চিন্তা-ভাবনা-গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করে মহান আল্লাহ তায়া'লা পবিত্র কুরআনে ফরমান:
٢٩- كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ ◯
“আমি আপনার নিকট বরকতময় কিতাব (আল কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে করে তার আয়াতসমূহ নিয়ে তারা গবেষণা করে।” (সূরাহ ছা-দ: ২৯)
٨٢- أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّـهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
فَلَا “তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? উহা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত তবে তারা তাতে অনেক মতপার্থক্য পেত।” (নিসা- ৮২)
আল কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব
٢٤- أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا ◯
أَفَلَতারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা মেরে দেয়া হয়েছে?” (সূরা মুহাম্মাদ- ২৪)
‘তারা কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না, যাতে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারে! বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের হৃদয়।’ (সূরা হজ : ৪৬)
‘তবে কি তারা লক্ষ্য করে না উটের প্রতি, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে এবং পাহাড়সমূহের প্রতি, কীভাবে তাকে প্রথিত করা হয়েছে এবং ভূমির প্রতি, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে’। (সূরা গাশিয়া ১৭-২০)
‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে এবং দিবা-রাত্রির আবর্তনের মধ্যে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! এ সবকিছু তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সব পবিত্রতা একমাত্র তোমারই। আমাদের তুমি দোজখের শাস্তি হতে বাঁচাও। (সূরা আল-ইমরান ১৯০-৯১)
"ওয়াতিলকাল আমচালু নাদ্বরিবুহা-লিন্নাসি লায়া'ল্লাহুম ইয়াতাফাক্কারু—ন"।
অর্থঃ "মানুষের জন্য আমি এসব দৃষ্টান্ত এ জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা করে"।
ইসলামের সত্যতা নিরূপণে এবং ঈমানের পরিপক্বতা অর্জনে পবিত্র কোরআন নিয়ে অব্যাহত চিন্তাভাবনা-গবেষণার বিকল্প নেই। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার জন্য মানবকুলকে আহ্বান জানিয়েছেন।
ঙ) ইবনু আব্বাস (রা:) এর জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দুআ:
اللهم فقه في الدين وعلمه التأويل(( (رواه أحمد و ابن أبي شيبة وابن سعد والحاكم والطبراني في الكبير
“হে আল্লাহ তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান কর এবং তা’বীল তথা কুরআনের তাফসীর শিক্ষা দান কর।” (আহমাদ, ইবনু আবী শায়বাহ,ইবনু সা’দ,হাকেম ও ত্বাবরানী কাবীর গ্রন্থে।)
গবেষণা ও চিন্তাচর্চায় আল কোরআনের অনুপ্রেরণা
সূরা আনফালে বলা হয়েছে: ‘আর তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না,যারা বলে যে, আমরা শুনেছি,অথচ তারা শোনে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই মূক ও বধির,যারা উপলব্ধি করে না।’(সূরা আনফাল : ২১, ২২)
:‘বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? (সূরা : আনআম : ৫০ )
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী! বলে দাও, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করো।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত ১০১)
প্রকৃতি নিয়ে, সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে, মহাজাগতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভেবে না দেখাকে আল্লাহ তায়ালা তিরস্কার করেছেন। কোরআনের ঘোষণা- 'তারা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না, আল্লাহ আসমান ও জমিন এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুই যথাযথভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন। (সূরা রুম, আয়াত ৮)
[তাফসিরে মা'আরেফুল কোরআন ও ইবনে কাছির অবলম্বনে]
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ-
“এটি এক কল্যাণময় কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে তারা এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে” (ছোয়াদ ৩৮/২৯)।
َفَلاَ يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلاَفًا كَثِيرًا-
“তারা কেন কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? যদি এটা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু নিকট থেকে আসত, তাহ’লে তারা এর মধ্যে বহু গরমিল দেখতে পেত” (নিসা ৪/৮২)।
যারা কুরআন গবেষণা করেনা, তাদের প্রতি ধমক দিয়ে আল্লাহ বলেন,أَفَلاَ يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا- ‘তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? নাকি তাদের হৃদয়গুলি তালাবদ্ধ?’ (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)।
কুরআন অনুধাবনের মূলনীতি :
কুরআন অনুধাবনের প্রধান মূলনীতি হ’ল, কুরআনের যিনি বাহক, তাঁর বুঝ অনুযায়ী কুরআন অনুধাবন করা। অতঃপর তিনি যাদের কাছে কুরআন ব্যাখ্যা করেছেন, সেই ছাহাবীগণের বুঝ অনুযায়ী অনুধাবন করা। এর বাইরে ব্যাখ্যা দিতে গেলে পথভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
কুরআন অনুধাবনের গুরুত্ব :
কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যই হ’ল তাকে বুঝা, অনুধাবন করা ও সে অনুযায়ী কাজ করা। শুধুমাত্র পাঠ করা ও মুখস্ত করা নয়। হাসান বাছরী (২১-১১০ হি./৬৪২-৭২৮ খৃ.) বলেন, আল্লাহর কসম! কুরআন অনুধাবনের অর্থ কেবল এর হরফগুলি হেফয করা এবং এর হুদূদ বা সীমারেখাগুলি বিনষ্ট করা নয়। যাতে একজন বলবে যে, সমস্ত কুরআন শেষ করেছি। অথচ তার চরিত্রে ও কর্মে কুরআন নেই’।[ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা ছোয়াদ ২৯ আয়াত।] তিনি বলতেন, কুরআন নাযিল হয়েছে তা বুঝার জন্য ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য। অতএব তোমরা তার তেলাওয়াতকে আমলে পরিণত কর’।[ ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালিকীন (বৈরূত : তাহকীক সহ দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ৩য় সংস্করণ ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খৃ.) ১/৪৫০।]
জ্যেষ্ঠ তাবেঈ মুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল-কুরাযী বলেন, ফজর পর্যন্ত পুরা রাতে সূরা যিলযাল ও ক্বারে‘আহ পাঠ করা এবং তার বেশী পাঠ না করা আমার নিকটে অধিক প্রিয়, সারা রাত্রি কুরআন তেলাওয়াতের চাইতে’।[ আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, আয-যুহ্দ (বৈরূত : দারুল কিতাবিল্ ইলমিয়াহ, তাহকীক : হাবীবুর রহমান আ‘যামী, তাবি) ক্রমিক ২৮৭, পৃ. ৯৭।] এর দ্বারা তিনি কুরআন অনুধাবনের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।
ইবনু জারীর ত্বাবারী (২২৪-৩১০ হি./৮৩৯-৯২৩ খৃ.) বলেন, কুরআন অনুধাবন অর্থ আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণসমূহ অনুধাবন করা, তাঁর বিধান সমূহ জানা, তাঁর উপদেশ সমূহ গ্রহণ করা ও সে অনুযায়ী আমল করা’।[ইবনু জারীর, তাফসীর ত্বাবারী সূরা ছোয়াদ ২৯ আয়াত।]
সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খৃ.) বলেন, কুরআন অনুধাবন করাটাই হ’ল মূল উদ্দেশ্য। কেননা কুরআনই হবে কর্মপদ্ধতি ও আচরণে পথ প্রদর্শক। এর মাধ্যমেই মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করবে’।[সৈয়ূত্বী, আল-ইতক্বান (মিসর : আল-হাইআতুল মিছরিইয়াহ, ১৩৯৪/১৯৭৪) ১/৩৬৮।]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই কিতাবের মাধ্যমে বহু সম্প্রদায়কে উঁচু করেন ও অনেককে নীচু করেন’।[ মুসলিম হা/৮১৭; মিশকাত হা/২১১৫।] কুরআনের অনুধাবনকারী ও আমলকারীদের পরকালীন উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে নাউওয়াস বিন সাম‘আন (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, ক্বিয়ামতের দিন কুরআন ও তার বাহককে আনা হবে। যারা তার উপর আমল করেছিল। যাদের সম্মুখে থাকবে সূরা বাক্বারাহ ও আলে ইমরান। সে দু’টি হবে মেঘমালা সদৃশ। যার মধ্যে থাকবে চমক’।[মুসলিম হা/৮০৫; মিশকাত হা/২১২১।]
কুরআন অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা :
(১) আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অবগত হওয়া ও সে অনুযায়ী আমল করা। এটিই হ’ল প্রধান বিষয়। ইহূদী আলেমরা তাওরাত পড়ত ও তার বিপরীত আমল করত। এমনকি তারা শাব্দিক পরিবর্তন ঘটাতো। নাছারাগণ একই নীতির অনুসারী ছিল। ফলে উভয় উম্মত মাগযূব (অভিশপ্ত) ও যাল্লীন (পথভ্রষ্ট) হয়ে গেছে। মুসলিম উম্মাহর আলেমরাও যেন সে পথে না যায়। সেজন্য সতর্ক করে আল্লাহ আহলে কিতাবদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন,وَإِذْ أَخَذَ اللهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلاَ تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ- ‘আর আল্লাহ যখন আহলে কিতাবদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমরা অবশ্যই (শেষনবী মুহাম্মাদের আগমন ও তার উপর ঈমান আনার বিষয়টি) লোকদের নিকট বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না। অতঃপর তারা তা পশ্চাতে নিক্ষেপ করল এবং গোপন করার বিনিময়ে তা স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করল। কতই না নিকৃষ্ট তাদের ক্রয়-বিক্রয়’ (আলে ইমরান ৩/১৮৭)।
(২) ঈমান বৃদ্ধি পাওয়া :
কুরআন অনুধাবন করে পাঠ করলে পাঠকের ঈমান বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি আয়াত ও সূরা তার মনের মধ্যে গভীরভাবে রেখাপাত করে। কারণ এসময় তার চোখ-কান-হৃদয় সবকিছু কুরআনের মধ্যে ডুবে থাকে। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন,وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ- ‘আর যখন কোন সূরা নাযিল হয়, তখন তাদের মধ্যেকার কিছু (মুশরিক) লোক বলে, এই সূরা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? বস্ত্ততঃ যারা ঈমান এনেছে, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দ লাভ করেছে’ (তওবাহ ৯/১২৪)। তিনি আরও বলেন,إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ- ‘নিশ্চয়ই মুমিন তারাই, যখন তাদের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর সমূহ ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে’ (আনফাল ৮/২)।
(৩) আল্লাহভীতি অর্জন :
অনুধাবনের সাথে কুরআন পাঠ করার মাধ্যমে হৃদয়-মন শিহরিত হয়। আল্লাহর অসীম ক্ষমতা অবহিত হয়ে ভয়ে অন্তর জগত কেঁপে ওঠে। ফলে পাপ চিন্তা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ হয়। যেমন আল্লাহ বলেন,اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللهِ ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ- ‘আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী (কুরআন) নাযিল করেছেন যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যা পুনঃ পুনঃ পাঠ করা হয়। এতে তাদের দেহচর্ম ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের দেহমন প্রশান্ত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটি (কুরআন) হ’ল আল্লাহর পথনির্দেশ। এর মাধ্যমে তিনি যাকে চান পথ প্রদর্শন করেন। আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ দেখানোর কেউ নেই’ (যুমার ৩৯/২৩)।
অন্যত্র তিনি বলেন, قُلْ آمِنُوا بِهِ أَوْ لَا تُؤْمِنُوا إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ سُجَّدًا-وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا- وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا- ‘তুমি বলে দাও (হে অবিশ্বাসীগণ!), তোমরা কুরআনে বিশ্বাস আনো বা না আনো (এটি নিশ্চিতভাবে সত্য)। যাদেরকে ইতিপূর্বে জ্ঞান দান করা হয়েছে (আহলে কিতাবের সৎ আলেমগণ), যখন তাদের উপর এটি পাঠ করা হয়, তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে’। ‘আর তারা বলে, মহাপবিত্র আমাদের পালনকর্তা! আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি অবশ্যই কার্যকর হয়’। ‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায়’ (ইসরা ১৭/১০৭-০৯)। ইবনু হাজার (৭৭৩-৮৫২ হি.) বলেন, খুশূ‘ তথা আল্লাহভীতি অর্জনই কুরআন তেলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য(الْخُشُوعَ الَّذِي هُوَ مَقْصُودُ التِّلاَوَةِ)।[ ফাৎহুল বারী হা/৫০৪৮-এর পূর্বে ‘তারজী‘ অনুচ্ছেদ-এর আলোচনা।]
(৪) সার্বিক হেদায়াত লাভ :
তাৎপর্য অনুধাবনের মাধ্যমে কুরআন পাঠ করলে জীবনের চলার পথে সার্বিক হেদায়াত লাভ করা যায়। ছোট-খাট বিষয়গুলি তখন বড় হয়ে দেখা দেয় না। বরং বৃহত্তর কল্যাণের বিষয় ও সার্বিক মঙ্গলের বিষয়টি তার সামনে প্রতিভাত হয়। ফলে সে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বেঁচে যায়। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا ‘নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয় যা সবচাইতে সরল। আর তা সৎকর্মশীল মুমিনদের সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার’ (ইসরা ১৭/৯)।
(৫) কুরআনের স্বাদ আস্বাদন ও হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ :
কুরআনের শব্দালংকার বুঝদার পাঠকের অন্তরে ঝংকার তোলে। এর গভীর তাৎপর্য জ্ঞানজগতকে চমকিত করে। এর বিজ্ঞান ও অতীত ইতিহাস মানুষকে হতবিহবল করে। বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে হৃদয় প্রশান্ত হয়। এক পর্যায়ে সমর্পিত চিত্ত প্রশান্তিতে ভরে যায়। ইবনু জারীর ত্বাবারী বলেন, আমি বিস্মিত হই ঐ ব্যক্তির জন্য, যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করে। অথচ এর তাৎপর্য অনুধাবন করে না। সে কিভাবে এর স্বাদ আস্বাদন করবে?[ ইবনু জারীর, তাফসীর ত্বাবারী, (বৈরূত : মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্করণ ১৪২০/২০০০) ‘ভূমিকা’ অধ্যায় ১/১০ পৃ.।]
(৬) আল্লাহর কিতাবের জন্য দন্ডায়মান হওয়া :
কুরআনের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারলে এর হক ও সীমারেখা সমূহ আদায়ে পাঠক দন্ডায়মান হবে। এর মর্যাদা রক্ষায় উৎসর্গীতপ্রাণ হবে। সর্বাবস্থায় এর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করবে এদিকে ইঙ্গিত করেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,«الدِّينُ النَّصِيحَةُ» قُلْنَا لِمَنْ؟ قَالَ : لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ ‘দ্বীন হ’ল নছীহত’। আমরা বললাম, কাদের জন্য হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য ও সকল মুসলমানের জন্য’।[ মুসলিম হা/৫৫; মিশকাত হা/৪৯৬৬।]
এখানেالنَّصِيْحَةُ لِكِتَابِهِ ‘আল্লাহর কিতাবের জন্য নছীহত’-এর তাৎপর্য হ’ল এ বিষয়ে হৃদয়ে পরিচ্ছন্ন ঈমান পোষণ করা যে, আল্লাহর কালাম চূড়ান্ত সত্য। এটি কোন মানুষের কালামের সদৃশ নয়। এরূপ কালাম কোন সৃষ্টির পক্ষে সম্ভব নয়। অতঃপর আল্লাহর কিতাবের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করতে হবে ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তেলাওয়াত করতে হবে। এর ‘মুহকাম’ বা স্পষ্ট আয়াত সমূহের অর্থ বুঝতে হবে। তার আদেশ-নিষেধের উপরে আমল করতে হবে ও ‘মুতাশাবিহ’ বা অস্পষ্ট অর্থবোধক আয়াত সমূহের উপরে ঈমান রাখতে হবে যে, এগুলির প্রকৃত তাৎপর্য কেবলমাত্র আল্লাহ জানেন। অমুসলিম বিদ্বানদের অহংকার চূর্ণ করার জন্যই এগুলি নাযিল হয়েছে। কিতাবে বর্ণিত বিজ্ঞানময় আয়াত সমূহে গবেষণা করতে হবে। তা থেকে আলো নিয়ে সমাজ পরিশুদ্ধ করার সাধ্যমত চেষ্টা চালাতে হবে। এই কালামের সর্বোচ্চ মর্যাদা রক্ষার জন্য সর্বদা দন্ডায়মান থাকতে হবে।
(৭) হালাল-হারাম জানা :
জীবন সংশ্লিষ্ট বহু বৈধ-অবৈধ বিষয় মানুষ জানতে পারবে কুরআন অনুধাবনের মাধ্যমে। যা তার বৈষয়িক জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে দূরে থাকতে পারবে। সেকারণ আল্লাহ বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلاَ تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ- ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন’ (বাক্বারাহ ২/২০৮)।
(৮) ভিতর ও বাইরের রোগ সমূহের আরোগ্য :
গভীর অনুধাবনের সাথে কুরআন পাঠের মাধ্যমে ভিতরকার বহু সন্দেহবাদ দূরীভূত হয়। বহু অন্যায় আকাংখা অন্তর্হিত হয়। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ ‘হে মানব জাতি! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসে গেছে উপদেশবাণী (কুরআন) এবং অন্তরের রোগসমূহের নিরাময়কারী এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথ প্রদর্শক ও রহমত’ (ইউনুস ১০/৫৭)। তিনি আরও বলেন,وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَلاَ يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلاَّ خَسَارًا ‘আর আমরা কুরআন নাযিল করি, যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও রহমত স্বরূপ। কিন্তু পাপীদের জন্য তা কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি করে’ (ইসরা ১৭/৮২)।
ইবনু জারীর বলেন, কুরআন মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি দেয়। মুমিনগণ এর মাধ্যমে অন্ধকারে আলোর পথ খুঁজে পান। অবিশ্বাসীরা নয়। কেননা মুমিনগণ কুরআনের হালাল-হারাম মেনে চলেন। সেজন্য আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করান ও আযাব থেকে রক্ষা করেন। আর এটাই হ’ল তাঁর পক্ষ হ’তে রহমত ও অনুগ্রহ’।[ইবনু জারীর, তাফসীর ত্বাবারী সূরা ইসরা ৮২ আয়াত।] যা তিনি তাদেরকে দান করেন। এছাড়া শারঈ ঝাড়-ফুঁক মুমিনের দৈহিক আরোগ্য দান করে থাকে আল্লাহর হুকুমে। এটা কেবল তার জন্যই হয়ে থাকে, যিনি কুরআন অনুধাবন করেন ও সে অনুযায়ী আমল করেন। ঐ ব্যক্তির জন্য নয়, যে কেবল ভান করে তেলাওয়াত করে। যার মধ্যে কোন খুশূ-খুযূ ও আনুগত্য নেই। এ কারণেই ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, কুরআন হ’ল আরোগ্য গ্রন্থ। যা আত্মা ও দেহ এবং দুনিয়া ও আখেরাত সবকিছুকে শামিল করে। ঐ ব্যক্তির জন্য যে ব্যক্তি একে পূর্ণ বিশ্বাস ও ভালোবাসার সাথে গ্রহণ করে এবং এর প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যের শর্ত সমূহ পূরণ করে। এটি আসমান ও যমীনের মালিকের কালাম। যদি এটি পাহাড়ের উপর নাযিল হ’ত, তাহ’লে তা ফেটে চৌচির হয়ে যেত। যমীনের উপর নাযিল হ’লে তা বিদীর্ণ হয়ে যেত। অতএব আত্মার ও দেহের এমন কোন রোগ নেই, কুরআনে যার আরোগ্যের নির্দেশনা নেই’।[ যাদুল মা‘আদ ৪/৩২৩।]
অনুধাবন ছাড়াই পাঠ করার ক্ষতি :
ঐ ব্যক্তি চিনির বলদের মত কেবল বোঝা বহন করেই জীবন কাটায়। কিন্তু চিনি মিষ্টি না তিতা বুঝতে পারে না। এই স্বভাব ছিল ইহূদী-নাছারাদের। যেমন আল্লাহ বলেন,وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لاَ يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلاَّ أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلاَّ يَظُنُّونَ ‘আর তাদের মধ্যে একদল নিরক্ষর ব্যক্তি রয়েছে, যারা আল্লাহর কিতাবের কিছুই জানে না স্রেফ একটা ধারণা ব্যতীত। আর তারা স্রেফ কল্পনা করে মাত্র’ (বাক্বারাহ ২/৭৮)। শাওকানী (১১৭২-১২৫০ হি.) বলেন, বলা হয়েছে যে, (أَمَانِيَّ) অর্থ তেলাওয়াত। অর্থাৎ তাদের নিকট আল্লাহর কিতাবের কোন বুঝ ও অনুধাবন ছিল না, কেবলমাত্র পাঠ করা ব্যতীত’।[শাওকানী, তাফসীর ফাৎহুল ক্বাদীর, সূরা বাক্বারাহ ৭৮ আয়াত।] ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেন, অত্র আয়াতে আল্লাহ তাঁর কিতাবের পরিবর্তনকারীদের এবং উম্মীদের নিন্দা করেছেন, যারা পাঠ করা ব্যতীত আর কিছুই জানে না। আর এটাই হ’ল (أَمَانِيَّ) বা কল্পনা’।[. আছ-ছাওয়াইকুল মুরসালাহ (রিয়াদ : দারুল ‘আছেমাহ, ১ম সংস্করণ ১৪০৮/১৯৮৮) ৩/১০৪৯।] অনুরূপভাবে ক্বিয়ামতের দিন উম্মতের পতনদশার কারণ সম্পর্কে আল্লাহর প্রশ্নের উত্তরে আমাদের রাসূল (ছাঃ) কৈফিয়ত দিয়ে বলবেন, وَقَالَ الرَّسُولُ يَارَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا ‘সেদিন রাসূল বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার উম্মত এই কুরআনকে পরিত্যক্ত গণ্য করেছিল’ (ফুরক্বান ২৫/৩০)। এর ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হি.) বলেন, কুরআন পরিত্যাগ করা অর্থ হ’ল এর অনুধাবন ও যথার্থ বুঝ হাছিলের চেষ্টা পরিত্যাগ করা’ (ঐ, তাফসীর)। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, কুরআন পরিত্যাগ করার কতগুলি অর্থ হ’তে পারে। তার মধ্যে অন্যতম হ’ল, কথক (আল্লাহ) কি বলতে চান, সেটা অনুধাবন না করা, বুঝার চেষ্টা না করা ও গভীর তত্ত্ব উদঘাটনের প্রচেষ্টা ত্যাগ করা’।[. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ২য় সংস্করণ ১৩৯৩/১৯৭৩) ৮২ পৃ.।]
কুরআন অনুধাবনের ফযীলত :
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহর কোন গৃহে একদল লোক যখন সমবেত হয় এজন্য যে, তারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে ও নিজেদের মধ্যে তার পর্যালোচনা করে, সেখানে কেবলই আল্লাহর পক্ষ হ’তে বিশেষ রহমত হিসাবে ‘সাকীনাহ’ (السكينة) অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর রহমত তাদের বেষ্টন করে রাখে ও ফেরেশতারা স্থানটি ভরে ফেলে। আর আল্লাহ তাদের সম্পর্কে তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন’।[মুসলিম হা/২৬৯৯; মিশকাত হা/২০৪।] এখানে ‘সাকীনাহ’ ও রহমত নাযিলের প্রধান কারণ হ’ল তেলাওয়াত ও অনুধাবন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের মধ্যে তেলাওয়াত আছে অনুধাবন নেই। ফলে রহমতও নেই।
কুরআন অনুধাবনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম) :
(ক) হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেন, তিনি এক রাতে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করছিলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) থেমে থেমে (مترسِّلا) ক্বিরাআত পড়ছিলেন। যখনই কোন তাসবীহ অর্থাৎ আল্লাহর গুণগানের আয়াত অতিক্রম করতেন, তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতেন। যখন কোন প্রার্থনার আয়াত অতিক্রম করতেন, তখন প্রার্থনা করতেন। যখন আল্লাহর নিকট পানাহ চাওয়ার আয়াত অতিক্রম করতেন, তখন পানাহ চেয়ে ‘আঊযুবিল্লাহ’ বলতেন’।[ মুসলিম হা/৭৭২।] এটাই ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর কুরআন বুঝে পড়া ও তার তাৎপর্য অনুধাবনের নমুনা।
(খ) আবু যার গেফারী (রাঃ) বলেন, এক রাতে রাসূল (ছাঃ) স্রেফ একটি আয়াত দিয়ে তাহাজ্জুদ শেষ করেন। এমতাবস্থায় ফজর হয়ে যায়। সেটি হ’ল,إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তাহ’লে তারা আপনার বান্দা। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তাহ’লে আপনি মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’।[ মায়েদাহ ৫/১১৮; নাসাঈ হা/১০১০।] এতে বুঝা যায়, তাঁর কুরআন অনুধাবন কত গভীর ছিল।
(গ) তরুণ ছাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল ‘আছ (রাঃ) যখন প্রতিদিন এক খতম কুরআন পাঠ করতে চাইলেন, তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে তিনদিনের কমে খতম করতে নিষেধ করে বললেন, তিনদিনের কমে খতম করলে সে কিছুই বুঝবে না’।[তিরমিযী হা/২৯৪৯; মিশকাত হা/২২০১।] এতে পরিষ্কার যে, কুরআন বুঝে পড়াটাই উদ্দেশ্য। কেবলমাত্র পাঠ করা নয়।
কুরআন অনুধাবনে ছাহাবায়ে কেরাম :
(১) আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, আমাদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি ১০টি আয়াত পাঠ করার পর আর আগে বাড়তেন না। যতক্ষণ না তার মর্ম অনুধাবন করতেন ও সেমতে আমল করতেন।[মুক্বাদ্দামা ইবনু কাছীর; তাফসীর ত্বাবারী হা/৮১, হাদীছ ছহীহ।]
(২) আবু আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ বিন হাবীব আস-সুলামী (মৃ. ৭২ হি.) বলেন, আমাদেরকে যারা কুরআন পাঠ করিয়েছেন তারা বলতেন, তারা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট থেকে যখন কুরআন পাঠ শিখতেন, তখন ১০টি আয়াত জানলে তারা আর তাঁর পিছে পড়তেন না, যতক্ষণ না ঐ আয়াতগুলির উপর তারা আমল করতেন। এভাবে আমরা কুরআন ও তদনুযায়ী আমল সবই শিখতাম।[ মুক্বাদ্দামা তাফসীর ইবনু কাছীর, সনদ জাইয়িদ।]
(৩) এদের মধ্যে ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর চাচাতো ভাই তরুণ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস। আল্লাহর রাসূল তাঁর জন্য দো‘আ করেছিলেন,اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِى الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ ‘হে আল্লাহ তুমি তাকে দ্বীনের বুঝ দান কর এবং এর যথার্থ ব্যাখ্যা শিক্ষা দাও’।[ আহমাদ হা/২৩৯৭; হাকেম হা/৬২৮০; ছহীহাহ হা/২৫৮৯। হাদীছের প্রথমাংশটি ছহীহ বুখারীতে রয়েছে (হা/১৪৩)।] সেকারণে ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, نِعْمَ تُرْجُمَانُ الْقُرْآنِ بْنُ عَبَّاسٍ ‘কুরআনের কতই না সুন্দর ব্যাখ্যাতা ইবনু আববাস’! (হাকেম হা/৬২৯১)। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) মারা গেছেন ৩২ হিজরীতে। তারপরেও ইবনু আববাস (রাঃ) ৩৬ বছর বেঁচে ছিলেন এবং ত্বায়েফে মৃত্যুবরণ করেন ৬৮ হিজরীতে। তাহ’লে বাকী জীবনে তিনি কুরআনকে আরও কত সুন্দরভাবেই না অনুধাবন করেছিলেন!
(৪) আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, পিতা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) ১২ বছরে সূরা বাক্বারাহ শেষ করেন। অতঃপর যেদিন শেষ হয়, সেদিন তিনি কয়েকটি উট নহর করে সবাইকে খাওয়ান’।[ মুক্বাদ্দামা তাফসীর কুরতুবী ‘আল্লাহর কিতাব শিক্ষা করা ও তা অনুধাবনের পদ্ধতি’ অনুচ্ছেদ, ৭৬ পৃ.; যাহাবী, তারীখুল ইসলাম (বৈরূত : দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ১ম সংস্করণ ১৪০৭/১৯৮৭) ৩/২৬৭।] ওমর (রাঃ)-এর ন্যায় একজন মহান ব্যক্তির এই দীর্ঘ সময় লাগার অর্থ সূরাটির গভীর তাৎপর্য অনুধাবনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা।
(৫) আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি ওমর (রাঃ)-এর দরবারে এল। তখন তিনি তাকে লোকদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। জবাবে লোকটি বলল, হে আমীরুল মুমেনীন! তাদের মধ্যে কেউ কেউ এরূপ এরূপভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে। তখন আমি বললাম, এত দ্রুত কুরআন তেলওয়াত করা আমি পসন্দ করি না। তখন ওমর (রাঃ) আমাকে থামালেন। এতে আমি দুঃখিত মনে বাড়ী ফিরে এলাম। অতঃপর তিনি আমার নিকটে এলেন এবং বললেন, ঐ লোকটি যা বলল, তার কোনটা তুমি অপসন্দ করলে? আমি বললাম, ওরা যত দ্রুত কুরআন পড়বে, তত আপোষে ঝগড়া করবে। প্রত্যেকেই নিজেরটাকে সঠিক বলবে। আর যখনই ঝগড়া করবে, তখনই বিরোধে লিপ্ত হবে। অবশেষে নিজেরা লড়াইয়ে রত হবে। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, তোমার পিতার জন্য আমার জীবন উৎসর্গীত হৌক। আমি এটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। অবশেষে তুমিই
সেটা বলে দিলে’।[ . মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/২০৩৬৮; যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৩/৩৪৮-৪৯।]
বস্ত্ততঃ ওমর ও ইবনু আববাস (রাঃ) যেটা ধারণা করেছিলেন, পরে সেটাই হয়েছিল। খারেজীরা বের হ’ল। তারা কুরআন পাঠ করত। কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করত না। অর্থাৎ তারা কুরআন অনুধাবন করত না এবং এর মর্ম উপলব্ধি করত না। ইতিহাসে এরাই প্রথম চরমপন্থী জঙ্গীদল হিসাবে কুখ্যাত। এরাই হযরত আলী (রাঃ)-কে কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যা করে।
(৬) ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূলের ছাহাবীদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি, যারা এই উম্মতের শীর্ষে অবস্থান করেন, তারা কুরআন হেফয করতেন না একটি সূরা বা অনুরূপ কিছু অংশ ব্যতীত। তারা কুরআনের উপর আমল করার রিযিক লাভ করেছিলেন। কিন্তু এই উম্মতের শেষ দিকের লোকেরা কুরআন তেলাওয়াত করবে। তাদের মধ্যে শিশু, অন্ধ সবাই থাকবে। কিন্তু তারা আমল করার রিযিক পাবে না’।[[26]. মুক্বাদ্দামা তাফসীর কুরতুবী ৭৫-৭৬ পৃ.।]
(৭) একই মর্মে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, আমাদের জন্য কুরআনের শব্দাবলী মুখস্ত করা খুবই কঠিন। কিন্তু এর উপর আমল করা সহজ। আর আমাদের পরের লোকদের অবস্থা হবে এই যে, তাদের জন্য কুরআন হেফয করা সহজ হবে। কিন্তু তার উপর আমল করা কঠিন হবে।[মুক্বাদ্দামা তাফসীর কুরতুবী ৭৫ পৃ.।]
(৮) মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) বলেন, তোমরা যতটুকু চাও ইলম অর্জন কর। মনে রেখ, আল্লাহ তোমাদেরকে কোনই পুরস্কার দিবেন না, যতক্ষণ না তোমরা তার উপরে আমল করবে’।[ মুক্বাদ্দামা তাফসীর কুরতুবী ৭৬ পৃ.।]
কুরআন অনুধাবনের অর্থ :
কুরআন অনুধাবনের অর্থ হ’ল কোন আয়াতের যথাযথ মর্ম নির্ধারণ করা এবং আয়াতের মুখ্য উদ্দেশ্য উপলব্ধি করা এবং সেখান থেকে আহকাম নিশ্চিত করা। এটা মোটেই সহজ নয় এবং এর জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলী। সেই সকল শর্ত ও নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ না করে কেউ কুরআন অনুধাবনের দাবী করতে পারে না। এতদ্ব্যতীত কুরআনে রয়েছে কেবল মৌলিক বিষয়াদির বর্ণনা। অতএব মূল হ’তে শাখা-প্রশাখা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা দানের বিরুদ্ধে সাবধানবাণী :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ قَالَ فِى الْقُرْآنِ بِغَيْرِ عِلْمٍ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ‘যে ব্যক্তি ইলম ব্যতিরেকে কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান করল, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা করে নিল’।[তিরমিযী হা/২৯৫০; শারহুস সুন্নাহ হা/১১৭; আহমাদ হা/২০৬৯; মিশকাত হা/২৩৪। ইমাম তিরমিযী ও ইমাম বাগাবী হাদীছটিকে ‘হাসান’ বলেছেন। তাফসীরে কুরতুবীর মুহাক্কিক আব্দুর রাযযাক আল-মাহদী বলেন, তিরমিযী উক্ত হাদীছকে ‘হাসান’ বলেছেন, সেটাই যথার্থ। তিনি বলেন, হাদীছের সকল সূত্র বিশ্বস্ত (মুক্বাদ্দামা তাফসীর কুরতুবী হা/৭০, পৃ. ৬৬)। কিন্তু শায়খ আলবানী ও শু‘আয়েব আরনাঊত্ব ‘যঈফ’ বলেছেন। সনদ যঈফ হ’লেও মর্ম ছহীহ। ]
ছাহেবে মির‘আত বলেন, উক্ত হাদীছের অর্থ হ’ল নিজস্ব রায় অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা। মরফূ‘ ও মওকূফ হাদীছ সমূহ থেকে এবং শারঈ বিধান সমূহে ও ভাষা জ্ঞানে অভিজ্ঞ শ্রেষ্ঠ বিদ্বানগণের বক্তব্য সমূহ অনুসন্ধান না করেই নিজের ধারণা মতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী বলেন, ঐ ব্যক্তির জন্য কুরআনের তাফসীরে প্রবেশ করা হারাম, যে ব্যক্তি কুরআনের ভাষা জানেনা, যে ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে এবং রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবী ও তাবেঈগণ থেকে বর্ণিত ব্যাখ্যা সম্পর্কে অবগত নয়। যে ব্যক্তি কুরআনের সূক্ষ্ম তত্ত্ব ও আয়াত নাযিলের কারণ এবং নাসেখ-মানসূখ সম্পর্কে অবগত নয়’।
হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, (ক) কুরআনের তাফসীরের জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি হ’ল কুরআন দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা করা। কেননা এক স্থানে আয়াতটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হ’লেও, অন্য স্থানে সেটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। (খ) যদি তুমি এতে ব্যর্থ হও, তাহ’লে সুন্নাহতে এর ব্যাখ্যা তালাশ কর। কেননা এটি কুরআনের ব্যাখ্যা ও তার মর্ম স্পষ্টকারী। আল্লাহ বলেন, ‘আমরা তোমার নিকটে নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে দাও যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যেন তারা চিন্তা-গবেষণা করে’ (নাহল ১৬/৪৪)। আর সুন্নাহ নিজেই তাঁর উপরে অহি আকারে নাযিল হয়েছে, যেমন তাঁর উপরে কুরআন নাযিল হয়েছে। যদিও তা কুরআনের ন্যায় তেলাওয়াত করা হয় না। অতঃপর যখন আমরা কুরআনে বা সুন্নাহতে কোন তাফসীর না পাব, তখন ছাহাবীগণের বক্তব্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করব। কেননা কোন অবস্থায় বা কোন প্রেক্ষিতে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার কারণে তাঁরা উক্ত বিষয়ে অধিক জ্ঞানী ছিলেন। আর এ বিষয়ে তাঁদের ছিল পূর্ণ বুঝ ও সঠিক জ্ঞান ও সঠিক আমল। বিশেষ করে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও গুরুজন ব্যক্তিগণ। যেমন চার খলীফা এবং আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ, আব্দুল্লাহ বিন আববাস প্রমুখ বিদ্বানগণ।
অতঃপর যখন তুমি কোন তাফসীর কুরআনে বা সুন্নাহতে বা ছাহাবীগণ থেকে না পাবে, তখন বহু বিদ্বান তাবেঈদের বক্তব্য সমূহের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। যেমন মুজাহিদ, আত্বা বিন আবী রাবা, সাঈদ বিন জুবায়ের প্রমুখ তাবেঈগণ। অনেকে বলেছেন, শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে তাবেঈদের বক্তব্য দলীল নয়। তাহ’লে কিভাবে সেটি তাফসীরের ক্ষেত্রে দলীল হবে? অর্থাৎ এটি তাদের বিরোধীদের বক্তব্যের উপরে দলীল হবে না, আর এটাই সঠিক। অতঃপর যখন তারা সবাই একটি ব্যাপারে একমত হবেন, তখন সেটার দলীল হওয়ায় কোন সন্দেহ থাকবে না। কিন্তু যদি তারা মতভেদ করেন, তাহ’লে তাদের একজনের বক্তব্য অন্যজনের উপর দলীল হবে না। যা তাদের পরবর্তীদের উপরেও হবে না। এমতাবস্থায় কুরআনের ভাষা অথবা সুন্নাহ অথবা আরবদের সার্বজনীন ভাষা রীতি অথবা উক্ত বিষয়ে ছাহাবীগণের বক্তব্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।فَأَمَّا تَفْسِيرُ الْقُرْآنِ بِمُجَرَّدِ الرَّأْيِ فَحَرَامٌ ‘মোটকথা কুরআনের তাফসীর স্রেফ রায়-এর মাধ্যমে করা হারাম’। এটাই হ’ল ইবনু কাছীরের বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত সার।[মির‘আত হা/২৩৬-এর আলোচনা; মুক্বাদ্দামা তাফসীর ইবনু কাছীর ১/৩৫-৩৬।]
হযরত আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ) বলতেন,أَيُّ أَرْضٍ تُقِلُّنِي، وَأَيُّ سَمَاءٍ تُظِلُّنِي، إِذَا قُلْتُ فِي الْقُرْآنِ مَا لاَ أَعْلَمُ ‘যদি আমি না বুঝে কুরআন সম্পর্কে কিছু বলি, তবে কোন যমীন আমাকে বহন করবে এবং কোন আকাশ আমাকে ছায়া দিবে?’ (তাফসীর ত্বাবারী ১/৭৮)।
মানব সৃষ্টিতত্ত্ব এবং আল কুরআন
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ثُمَّ لِتَكُونُوا شُيُوخًا وَمِنْكُمْ مَنْ يُتَوَفَّى مِنْ قَبْلُ وَلِتَبْلُغُوا أَجَلًا مُسَمًّى وَلَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ-
‘তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। অতঃপর শুক্রবিন্দু হতে, অতঃপর জমাট রক্ত হতে, অতঃপর তোমাদেরকে বের করে দেন শিশুরূপে। অতঃপর তোমরা পৌঁছে যাও যৌবনে। অতঃপর বার্ধক্যে। তোমাদের কারু কারু এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে এবং কেউ কেউ নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পর্যন্ত পৌঁছে যাও। যাতে তোমরা অনুধাবন কর।’ (গাফির/মুমিন ৪০/৬৭)।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আকল বা বিচার-বুদ্ধি ও ফিকর বা চিন্তা-চেতনার গুরুত্ব অত্যধিক। এ সম্পর্কে আল-কুরআনের নির্দেশনা এসেছে যে, أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوْا فِيْ أَنْفُسِهِمْ مَا خَلَقَ اللهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى وَإِنَّ كَثِيْرًا مِنَ النَّاسِ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُوْنَ- ‘তারা কি তাদের অন্তরে ভেবে দেখে না যে, আল্লাহ নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন সত্য সহকারে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য? কিন্তু অনেক মানুষ তাদের পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতে অবিশ্বাসী’ (রূম ৩০/৮)।
মানুষ যদি আল্লাহর সৃষ্টির এই নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা করে তাহ’লে বুঝতে পারবে যে, গোটা বিশ্ব সৃষ্টি এমনিতেই হয়নি। এর পিছনে এক বিরাট উদ্দেশ্য আছে এবং সবকিছুই একটি চরম পরিণতির দিকে যাচ্ছে। একসময় তাকে আল্লাহর সামনে হাযির হয়ে জবাব দিতেই হবে। যা মানুষকে আল্লাহমুখী করে। এজন্যই আল্লাহ কুরআনে ৪৯ বার ‘আকল’ ও ১৮ বার ‘ফিকর’ উল্লেখ করেছেন।
এছাড়াও আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহ দেখতে সারাবিশ্ব পরিভ্রমণের নির্দেশ দিয়ে বলেন,قُلْ سِيْرُوْا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوْا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ثُمَّ اللهُ يُنْشِئُ النَّشْأَةَ الْآخِرَةَ- ‘বল, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর। অতঃপর দেখ কিভাবে তিনি সৃষ্টিকর্ম শুরু করেছেন। অতঃপর আল্লাহ পরবর্তী সৃষ্টি করবেন’ (আনকাবূত ২৯/২০)।
বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান উপায় হ’ল পড়া। ইসলামের প্রথম নির্দেশ হ’ল ‘পড়’। এমনকি সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতেই মানবসৃষ্টির উপাদান ‘আলাক্ব’-এর মাঝেই বিজ্ঞানের অনেক মর্ম লুকিয়ে আছে। ইসলাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে কখনই নিরুৎসাহিত করে না। বরং এর সঠিক ও সুন্দর ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। মদীনায় নবী করীম (ছাঃ)-এর জীবনে এরকম অনেক প্রযুক্তিগত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধে যে পারসিক কৌশল ব্যবহার করা হয় তা ছিল আরবদের কাছে অপ্রচলিত প্রযুক্তি। ইসলামী সমাজের বিভিন্ন নীতিমালা যে কতটা বিজ্ঞানসম্মত তা আজ সুপ্রমাণিত।
স্বাস্থ্য এবং সূন্নাত-ই-রসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
একবার কোন এক রাষ্ট্রপ্রধান মহানবী (সা.)-কে উপঢৌকন হিসেবে একজন চিকিৎসক পাঠিয়েছিলেন মদীনায়। চিকিৎসক মদীনায় অনেক দিন থাকলেন। কিন্তু কোনো রোগীর দেখা পেলেন না। অবশেষে তিনি হুজুর (সা.)-এর কাছে আরজ করলেন, “আমি চলে যেতে চাই। কারণ মদীনায় আমি এসেছি চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনের জন্য। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন রোগীর দেখাই পাইনি।” রাসূলে আকরাম (সা.) অতি সিংক্ষেপে একটি মূল্যবান কথা বললেন, “আমরা পেটে ক্ষুধা লাগলে খাই এবং পেট পূর্ণ হওয়ার আগে খাওয়া বন্ধ করি। ফলে আমাদের স্বাভাবিক কোন রোগ হয় না।”
আমরা জানি স্বাস্থ্যই সুখের মূল। তাই আমরা স্বাস্থ্যের প্রতি সদা দৃষ্টি রাখি। প্রিয়জনের অসুস্থতার খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। অনেকটা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মত অতি আস্থা-বিশ্বাস আর আত্ম প্রত্যয়ের সাথেই পরামর্শ দিয়ে থাকি অমুক জিনিস খাবে, সাবধান অমুখ জিনিস খাবে না। এটি ব্যথা-বেদনায় খুবই ফলদায়ক ইত্যাদি ইত্যাদি। কলম কাগজ থাকলে লিখিই দিই বিভিন্ন ওষুধের নামও। এতে প্রমাণিত হয়, মানুষ নিজের, প্রিয়জনের স্বাস্থ্যের জন্য কত আন্তরিক এবং যত্নশীল। সত্যিই সুস্বাস্থ্য আল্লাহ তায়াল অপার নিয়ামত বটে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অআচারিত পুরো জীবন-জিন্দেগী কত স্বাস্থ্যসম্মত এবং বৈজ্ঞানিক তার কতিপয় দিক সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
১. ঘুম থেকে ওঠার পর দু’হাতের তালু দিয়ে মুখমন্ডল ও দুচোখ মর্দন করা।
এতে তন্দ্রাভাব দূর হয়ে যায়। (শামায়েলে তিরমিযী)
২. ঘুম থেকে উঠেই মিসওয়াক করা। (আবু দাউদ)
মিসওয়াক
মেসওয়াক ও আধুনিক বিজ্ঞান :
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে নবী আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহ কে ভালবাসতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন ও তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন, আর আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। [সূরা আল ইমরান : ৩১]
অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের নিকট রাসূল সা, যে আদর্শ নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর। এবং যে সমস্ত বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো। [সূরা হাশর : ৭]
রাসূল সা. বলেন মেসওয়াক হল মুখের পবিত্রতার মাধ্যম এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির কারণ। [বুখারী] হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা, বলেছেন যদি আমি আমার উম্মতের উপর কষ্টের আশংকা না করতাম তাহলে আমি তাদেরকে ইশার নামায বিলম্বে পড়তে এবং প্রত্যেক নামাযের পূর্বে মেসওয়াক করতে আদেশ করতাম। [বুখারী, মুসলিম]
শুরাইহ ইবনে হানী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা রা. কে জিজ্ঞেসা করলাম, রাসূল সা. যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন সর্বপ্রথম কি করতেন? উত্তরে তিনি বলে, ঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথমে তিনি মিসওয়াক করতেন [মুসলিম]
মিসওয়াক রাসূলে আকরামের (সা.) জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে মিসওয়াকরত অবস্থায়। হুজুর (সা.) মেসওয়াক সম্পর্কে অনেক ফযীলত বর্ণনা করেছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিদগণ এ সুন্নত থেকে বেশ কিছু তথ্য বের করেছেন। দাঁতের ভয়ংকর কয়েকটি রোগ হয়ে থাকে। যেমন : জিঞ্জিভাইটিস (Gingivitis), এ রোগ হলে দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে থাকে এবং পচন ধরে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। কেরিস টিথ- এ রোগ হলে দাঁতের ক্ষয় শুরু হয়। পাইয়োরিয়া (Pyorrhea)-এতে দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়, রক্ত ঝরে। মিসওয়াক এ রোগগুলো দূর করতে সক্ষম। গাছের ডাল দ্বারা মেসওয়াক করা স্নুত। ব্রাশ দ্বারা সুন্নত নয়। দেখা গেছে, পায়োরিয়া হলে দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়। তখন ডাক্তারগণ পরামর্শ দেন মাড়িতে শক্ত কিছু দিয়ে হালকা হালকা করে চাপ দেয়ার জন্য। মিসওয়াক এ ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করে যা ব্রাশে হয় না। তাছাড়া মিস
ওয়াকের চাপটা একটু শক্ত হওয়ায় দাঁত পরিষ্কার হয় বেশী।
৩. দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত ভালভাবে ধোয়ার পর পানির পাত্রে হাত দেওয়া। (তিরমিযী)
এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই জরুরী বিষয়। ঘুমে থাকাবস্থায় অচেতনভাবে শরীরের গুপ্তাঙ্গে স্বাভাবতই হাত যায়। ফলে সেখান থেকে নানা প্রকার রোগ জীবাণু হাতে লাগে। তাই সে হাত না ধুয়ে কিছু খেলে মারাত্মক রোগ হতে পারে। তাছাড়া হাতে লেগে থাকা জীবাণু থেকে বিভিন্ন প্রকার সংক্রামক রোগও হতে পারে। যেমন, গুহ্য দ্বারে হাত লাগলে এ থেকে বিভিন্ন রকম কৃমি তো আছেই, এছাড়াও পুরুষের গনোরিয়া থেকে অন্যজন সংক্রামিত হতে পারে। মেয়েদের ট্রাইকোমনাস (Trichomonus) থাকলে সংক্রামিত হতে পারে।
৪. পায়খানায় জুতা পায়ে মাথা আবৃত করে যাওয়া। (ইবনে সা’দ, যাদলু মা’দ)
পায়খানায় বহুবিধ রোগ জীবাণু থাকে, বিশেষ করে বক্রকৃমির ডিম (Hook Worm) যা খালি চোখে দেখার কোন উপায় নেই, খালি পা থাকলে এগুলো সহজেই ত্বকের গভীরে পৌঁছে যায়। ফলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। রক্ত স্বল্পতা, অনিয়মিত পায়খানা হয়। শরীরে ঘন ঘন জ্বর দেখা দেয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। জুতা পায়ে থাকলে সে আশংকা আর থাকে না।
মাথায় কাপড় দেয়া
ওয়াশ রুম বা টয়লেট প্রস্রাব-পায়খানার নিরাপদ স্থান। অআধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সায়েন্স-এ মূলতঃ রোগীর সঠিক রোগ নির্ণয়ে তার প্রস্রাব-পায়খানার প্যাথলজিক্যাল টেস্ট খুবই জরুরী। কারণ, প্রস্রাব-পায়খানায় রোগীর রোগের জীবাণু নিহিত থাকে।
মাথার চুল সংবেদনশীল। এগুলো যেমন অতি সহজে জীবাণু ধারণ করতে পারে তেমনি জীবাণু ছড়াতেও সক্রিয়। তাই অস্ত্রোপচারের সময় ডাক্তারগণকে দেখা যায়, তারা মুখমন্ডল ছাড়া মাথাও টুপি দিয়ে ঢেকে ফেলেন যাতে করে কোন রোগ জীবাণু ছড়াতে না পারে। হোটেল-রেস্তোরাতেও এখন হোটেল বয়রা বিশেষ ধরণের টুপি ব্যবহার করেন যাতে চুল হতে রোগ জীবাণু খাবার টেবিলে না ছড়ায়।
পায়খানায় অসংখ্য রোগ জীবাণু ছড়িয়ে থাকে। মাথা আবৃত থাকলে চুল সে জীবাণু ধারণ থেকে রক্ষা পায়।
৫. পেশাব পায়খানায় ছিটাফোটা থেকে সতর্ক থাকা। (বোখারী, তিরমিযী)
লক্ষণীয় বিষয়গুলো, শরীরে যে সমস্ত রোগ জীবাণু বের হয়, এর ৯০ শতাংশ প্রস্রাবের সাথে আর ১০ ভাগ পায়খানার সাথে বের হয়। প্রস্রাবের ছিঁটাফোটা থেকে সতর্ক থাকা শুধু সুন্নতের জন্য নয়, স্বাস্থ্যের জন্য এদিকে লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত জরুরী। তাছাড়া, ইসলামী শরীয়াতে প্রস্রাব নাজাসাতে গলিজা বা কঠিন নাপাকী যা সালাত বা নামাজে আদায়ে অযোগ্য। কারণ, নামাজের ১৩ ফরজের এক ফরজ জামা পাক।
অযু করা
সালাত বা নামায আদায় এবং পবিত্র কোরআন স্পর্শের জন্য অযু করা ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ পাক না হয়ে তোমরা কোরআন স্পর্শ করো না।
শরীরের যে অঙ্গগুলো কাপড়ের বাইরে থাকে, যেমন হাত, মুখমন্ডল, পা, টাখনু পর্যন্ত। অযুতে এসব যায়গা ধুতে হয়। ফলে এগুলো রোগজীবাণুমুক্ত হয়। এছাড়া ধোয়ার সময় এ সকল স্থানের স্নায়ু (Nerve) ও উপশিরা (Capillary) গুলো ঠান্ডা হয় যাতে রক্তের স্পন্দন সহজ হয়।
দাঁড়ি রাখা
দাড়িতে পুরুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। দাঁড়ি না রাখলে মুখের ত্বকে দাগ পড়ে যায়। বার বার সেভ করার ফলে ত্বকের স্পর্শকাতরতা কমে যায়। দৃষ্টিশক্তি লোপ পেতে থাকে।
নাভির নীচের, বগলের চুল কাটা। (মুসলিম)
বগলের নীচের ও গুপ্তাঙ্গের চুল সব সময় ঢাকা থাকে বিধায় এগুলোতে ময়লা জমে। ফলে নানা ধরনের জীবাণুর জন্ম হয়। স্বাভাবতই এগুলো অনেক রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “চল্লিশ দিনের বেশী এগুলো না কাটলে গোনাহ হবে।” উল্লেখ্য, অআধুনিক সার্জারি বিজ্ঞানমতে রোগীর অপারেশনের অআগে কেবল নাভির নীচের পশম নয়, অআশ-পাশের বান্চিত লোমও ছেচে ফেলা হয় রোগ জীবাণু মুক্তকরণের জন্য।
চুল ধোয়া, তৈল লাগানো, আচড়ানো সুন্নাত
চুল ধুলে ময়লা দূর হয়। আচড়ালেও ময়লা পরিষ্কার হয়। চুলে তেল দিলে মাথা ঠান্ডা থাকে। গোড়া শক্ত হয়। চুলের শিকড় (Root) গভীরে থাকে। চুল কাল হয়।
নখ কাটা
সুস্থ স্বাস্থ্য রক্ষার্থে নখ কাটা অত্যন্ত জরুরী। নখ না কেটে খাবার খেলে সেখানে জমে থাকা ময়লা পেটে গেলে খাবার হজমে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। আমাশয়, ডায়রিয়া, টাইফয়েড ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কৃমির জন্ম হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সূঁচ কৃমি (Pinworm) ও বক্র কৃমি (Hookworm), হয়ে থাকে। সূঁচ কৃমি হলে চুলকানির সৃষ্টি হয়। গুহ্যদ্বারে একজিমা দেখা দেয়। রাতে ঘন ঘন পেশাব হয়। ভেজাইনেটিস (Veginetis) রোগের প্রাদুর্ভাব হয়।
মাথা আবৃত করে খানা খাওয়া
পূর্বেই বলা হয়েছে মাথার চুল সংবেদনশীল। এগুলো যেমন জীবাণু ধারণ করতে পারে, তেমনি ছড়াতেও পারে দ্রুত। তাই খাবারে যাতে জীবাণু ছড়াতে না পারে সেজন্য মাথা ঢাকার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে।
আঙ্গুল চেটে খাওয়া (তিরমিযী)
খাওয়ার পর আঙ্গুল চেটে খাওয়া সুন্নাত। (তিরমিযী)
এ সুন্নত থেকে চিকিৎসাবিদগণ সুন্দর তথ্য বের করেছেন। খাওয়া শেষ হলে আঙ্গুল চাটার সময় মুখের ভেতর সেলিভারী গ্ল্যান্ড (SalivaryGland) থেকে টায়ালিন (Ptyalin) নামক এক প্রকার পাচক রস বের হয়, যা খাবার পাকস্থলী থেকে শিষণ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই প্রায় অর্ধেক হজম হয়ে যায়।
গোসল করা
কথিত আছে যে, মধ্যযুগের ইউরোপীয়রা নিয়মিত গোসলে অভ্যস্ত ছিলেন না। তখনকার আরব মুসলমানরা পানি সংরক্ষণাগার হাউজ প্রথার প্রচলন করে গোসল-কে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং প্রসারিত করেছিলেন। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা নিয়মিত গোসলে রোগীকে উৎসাহিত করে থাকেন।
প্রথমে মাথায় ও কাঁধে পানি দেওয়া। গোসল করলে শরীরের ময়লা দূর হয়। রোগ জীবাণু থাকে না। মাথায় পানি দেয়ার ফলে মস্তিষ্ক ঠাণ্ডা থাকে এবং উচ্চ রক্তচাপ দূর হয়।
জুতা পায়ে দেওয়া
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত জুতা পরিধান করতেন। এমনি পবিত্র মিরাজুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালীন মহাকাশ পরিভ্রমণের সময়ও জুতা পরিধান অবস্থায় ছিলেন।
মাটিতে বহুবিধ রোগ জীবাণু ছড়িয়ে থাকে। শরীরের মধ্যে পায়ের পাতা নীচটাই মাটির সাথে লাগে বেশী। ফলে সেখানে কোন জীবাণু লেগে হতে পারে মারাত্মাক কোন রোগ, বিশেষ করে বক্র কৃমি, যা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, এগুলোর ডিম সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে। অনেক দিন পূর্বে এক স্থানে একটু মল ছিল; পরে ধুয়ে মুছে সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বক্র কৃমির ডিম নিঃশেষ হয়ে যায় না। এরা বহুদিন পর্যন্ত টিক থাকে। খালি পা পেলে এগুলো সহজেই গভীরে ঢুকে যায়।
খৎনা করা
মুসলমানদের একটা বিশেষ পালনীয় সুন্নত হলো খৎনা। লিঙ্গের উপরিভাগের বাড়তি চামড়া না কাটলে ভয়ানক রোগ হতে পারে। এই ত্বকের ভেতর জমে থাকা ময়লা বিষাক্ত হয়ে অনেক সময় চামড়া ফুটো হয়ে যায়। উপরে ফুটো হলে এটাকে ফাইমসিস (Phimosis) বলে। নীচে ফুটো হলে প্যারাফাইমসিস (Paraphimosis) বলে। এ রোগ হলে উপরের বাড়তি চামড়া না কাটলে চামড়ায় পচন ধরতে পারে। স্ত্রী সহবাসে মারাত্মক অসুবিধা হয়। এর ময়লার সাথে জমে থাকা বিভিন্ন রোগ জীবাণু স্ত্রীজরায়ুতে লেগে নানা রকম সংক্রামক রোগ দেখা দেয়। লিঙ্গের মাথায় মাংস জমে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে বিধায় ক্যান্সার হতে পারে।
মদ ও শূকরের গোশত না খাওয়া
এগুলো শুধু হুজুরের (সা.) পরিত্যাজ্য বস্তু নয়। কোরআন শরীফে আল্লাহ তা‘আলা এগুলোকে হারাম ঘোষণা করেছেন। মদ পান করলে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কোন ঔষধ শরীরে কাজ করে না। ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডে পানি জমে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে খুব অসুবিধা হয়। কিডনীতে অসুবিধা করে।
শূকরের গোস্তে এমন এক প্রকার জীবাণু থাকে যা সিদ্ধ করলেও সহজেই নষ্ট হয় না। এ জীবাণু থেকে দীর্ঘ স্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। ফিতা কৃমির (Tapeworm) সৃষ্টি হয়। বড়ি বড়ি পায়খানা হয়। রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়।
অযু করে ঘুমানো (যাদুল মা’দ)
সারাদিন ক্লান্তির পর রাতে শোয়ার সময় শরীর গরম ও মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে যায়। সেজন্য ভালভাবে ঘুম হয় না। ঘুমে স্বপ্ন দোষ হয়। ঘুমের প্রথমে অযু করলে উপশিরা স্নায়ু ঠাণ্ডা হয়। ঘাড় মাসেহ করায় তাৎক্ষণিক মাথা ঠাণ্ডা হয় এবং স্থির থাকে। ফলে ঘুম শান্তভাবে হয়। ঘুমে স্বপ্নদোষ খুব কম হয়।
ডান পাশে শোয়া
ডান দিকে কাত হয়ে শোয়া স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। খাদ্য পরিপাকে পাকস্থলীর কার্য প্রণালীর প্রবণতা ডানমুখী । তাই ডান দিকে কাত হয়ে শুলে খাবার পরিপাকে সুবিধা হয়।
অজু এবং ইবাদাত:
আমাদের দেহের জন্য নামাজের উপকারীতা
ইসলাম ধর্মে যে পাঁচটি কাজকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে তার মধ্যে সালাত বা নামাজ অন্যতম। এটা এমন একটি ইবাদত যা মানুষকে কেবল মহান আল্লাহ তায়ালার একেবারে নিকটবর্তীই করে না, এটি শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যকরও বটে।
নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল কাজের প্রতিরোধকারী (আল কুরআন)।
আমাদের প্রিয় নবী সা: বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হলো কারো বাড়ির পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত স্রোতধারার মতো। কোনো ব্যক্তি তাতে পাঁচবার গোসল করলে যেমন গায়ে ময়লা থাকতে পারে না, তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও মানুষকে পবিত্র করে দেয়।
নামাজের বৈজ্ঞানিক সুফল
সঠিক পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করলে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন মস্তিষ্ক, গর্দান, সিনা ও ফুসফুস সতেজ থাকে। এর ফলে হায়াত বৃদ্ধি পায়।
স্নায়ুর দুর্বলতা, জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা এবং অন্যান্য মাংসপেশীর ব্যাধির সুচিকিৎসা রয়েছে নিয়মিত সালাত অআদায়ের মধ্যে।
(তবে কেবল এসব সুবিধা লাভের নিয়তে নামাজ অআদায় জায়েজ নেই। কারণ, নামাজ আল্লাহর আদেশ প্রতিপালনের উদ্দেশ্যে আদায় করার জন্য করা হয়ে থাকে। তাতে যে সওয়াব এবং স্বাস্থ্যপ্রদ তা আল্লাহপাকের অশেষ ফজল, করম, রহমত, বরকত মাত্র।
এক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও জানা যায় যে, নামাজ আদায়ের দ্বারা অন্ততঃ আটটি রোগ থেকে মুক্তি লাভ করা যায় যা নিম্নরূপঃ
১. মানসিক রোগ ২. স্নায়ুবিক রোগ ৩. অস্খিরতা, ডিপ্রেশন ৪. মনস্তাত্ত্বিক রোগ ৫. হার্টের রোগ ৬. হাঁড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা ৭. ইউরিক অ্যাসিড থেকে সৃষ্ট রোগ এবং ৮. পাকস্খলী ও আলসারের রোগ।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে রোজা
‘‘ওয়া আনতা সুউমু খাইরুল লাকুম ইন্কুনতুম তা’লামুন’’- অর্থাৎ- ‘‘তোমরা যদি রোজা রাখ তবে তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ, তোমরা যদি সেটা উপলব্ধি করতে পার।’’ (সূরা বাকারাহ- ১৮৪)
ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত কল্যাণকর, পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (Complete Code of Life)। তাই এতে স্বাস্থ্যনীতিও রয়েছে। রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। সকল সক্ষম ঈমানদারদের উপর আল্লাহ রমযানের একমাস রোজা ফরজ করেছেন।
ইউরোপের ঘরে ঘরে ইদানীং রোজা করার হিড়িক পড়েছে। সবার মুখে এক কথা- শরীরটাকে ভালো রাখতে চাওতো রোজা পালন কর। ধারণা করা হচ্ছে, রোজা পালনের ব্যাপারে এ ধরনের চেতনা সৃষ্টির পিছনে সত্তর দশকে প্রকাশিত একটি বই বিশেষ ফলদায়ক। বইটি হচ্ছে প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিদ ড. হেলমুট লুটজানার-এর The Secret of Successful Fasting অর্থাৎ উপবাসের গোপন রহস্য। বইটিতে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের গঠন ও কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে নিরোগ, দীর্ঘজীবী ও কর্মক্ষম স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে বছরের কতিপয় দিন উপবাসের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ড. লুটজানারের মতে, খাবারের উপাদান থেকে সারাবছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টকসিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস। উপবাসের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে দহনের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শরীরের ভিতর জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থসমূহ দগ্ধীভূত হয়ে যায়।
উল্লেখ্য যে, ‘রমযান’ শব্দটি আরবির ‘রমজ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি। এর অর্থ দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া ও পুড়িয়ে ফেলা। এভাবে ধ্বংস না হলে, ঐসব বিষাক্ত পদার্থ শরীরের রক্তচাপ, একজিমা, অন্ত্র ও পেটের পীড়া ইত্যাদি বিভিন্ন রোগব্যাধির জন্ম দেয়। এছাড়াও উপবাস কিড্নী ও লিভারের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরে নতুন জীবনীশক্তি ও মনে সজীবতার অনুভূতি এনে দেয়।
রোজা পালনের ফলে মানুষের শরীরে কোন ক্ষতি হয় না বরং অনেক কল্যাণ সাধিত হয়, তার বিবরণ কায়রো থেকে প্রকাশিত ‘Science Calls for Fasting’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন, “The power and endurance of the body under fasting conditions are remarkable : After a fast properly taken the body is literally born afresh.”
অর্থাৎ রোজা রাখা অবস্থায় শরীরের ক্ষমতা ও সহ্যশক্তি উল্লেখযোগ্য : সঠিকভাবে রোজা পালনের পর শরীর প্রকৃতপক্ষে নতুন সজীবতা লাভ করে।
রোজা একই সাথে দেহে রোগ প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রোজাব্রত পালনের ফলে দেহে রোগ জীবাণুবর্ধক জীর্ণ অন্ত্রগুলো ধ্বংস হয়, ইউরিক এসিড বাধাপ্রাপ্ত হয়। দেহে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিভিন্ন প্রকার নার্ভ সংক্রান্ত রোগ বেড়ে যায়। রোজাদারের শরীরের পানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার ফলে চর্মরোগ বৃদ্ধি পায় না।
আধুনিক যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোজার ব্যবহারিক তাৎপর্য উপলব্ধি করেই জার্মান, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ব্যবস্থাপত্রে প্রতিবিধান হিসেবে এর উল্লেখ করা হচ্ছে।
ডা. জুয়েলস এমডি বলেছেন, ‘‘যখনই একবেলা খাওয়া বন্ধ থাকে, তখনই দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করে।’’
ডক্টর ডিউই বলেছেন, ‘‘রোগজীর্ণ এবং রোগক্লিষ্ট মানুষটির পাকস্থলী হতে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেল, দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না, সত্যিকাররূপে উপবাস থাকছে রোগটি।’’
তাই একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার রোগীদের তিন সপ্তাহের জন্য উপবাস পালনের বিধান দিতেন।
ডা. আলেক্স হেইগ বলেছেন, ‘‘রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি এবং বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তিশক্তি পরিবর্ধিত হয়। প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি, অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। এটা খাদ্যে অরুচি ও অনিচ্ছা দূর করে। রোজা শরীরের রক্তের প্রধান পরিশোধক। রক্তের পরিশোধন এবং বিশুদ্ধি সাধন দ্বারা দেহ প্রকৃতপক্ষে জীবনীশক্তি লাভ করে। যারা রুগ্ন তাদেরকেও আমি রোজা পালন করতে বলি।’’
বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড নারায়াড বলেন, ‘রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিষ্ক রোগ নির্মূল করে দেয়। মানবদেহের আবর্তন-বিবর্তন আছে। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির শরীর বারংবার বাহ্যিক চাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি দৈহিক খিচুনী এবং মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয় না।’’
প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ুটডতটঢঢণভ সাহেব মনের প্রগাঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে রোজার ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘রোজার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে কি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা হলো তার ওপর বুদ্ধিবৃত্তির কর্মক্ষমতা নির্ভর করে না। বরং কতিপয় বাধ্যবাধকতার উপরই তা নির্ভরশীল। একজন যত রোজা রাখে তার বুদ্ধি তত প্রখর হয়।’’
ডাঃ এ, এম গ্রিমী বলেন, ‘‘রোজার সামগ্রিক প্রভাব মানব স্বাস্থ্যের উপর অটুটভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে এবং রোজার মাধ্যমে শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।’’
ডাঃ আর, ক্যাম ফোর্ডের মতে, ‘‘রোজা হচ্ছে পরিপাক শক্তির শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।’’
ডাঃ বেন কিম তাঁর এক প্রবন্ধে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ (হাঁপানী), শরীরের র্যাশ, দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা, অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষতিকর নয় এমন টিউমার ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে তিনি বলেন, উপবাসকালে শরীরের যেসব অংশে প্রদাহ জনিত ঘা হয়েছে তা পূরণ (Šণযটধর) এবং সুগঠিত হতে পর্যাপ্ত সময় পেয়ে থাকে। বিশেষত খাদ্যনালী পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াতে তার গায়ে ক্ষয়ে যাওয়া টিস্যু পুনরায় তৈরি হতে পারে। সাধারণত দেখা যায় টিস্যু তৈরি হতে না পারার কারণে অর্ধপাচ্য আমিষ খাদ্যনালী শোষণ করে দূরারোগ্য সব ব্যাধির সৃষ্টি করে ডাঃ বেন কিম আরো বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন উপবাস কিভাবে দেহের সবতন্ত্রে (ওর্হ্রণব) স্বাভাবিকতা রক্ষা করে।
প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ জন ফারম্যান এক নিবন্ধে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় উপবাস এবং খাবার গ্রহণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে উপবাসের স্বপক্ষে মত দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় রমযানের রোজা রাখার সুফল পাওয়া যায় না মূলত খাদ্যাভ্যাস ও রুচির জন্য।
বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘রোজা মানুষের দেহে কোন ক্ষতি করে না।
প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার :
মানবতার কল্যাণে বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনযাপনকে সহজ ও সাবলীল করেছে। এর সদ্ব্যবহারে সুফল এবং অসদ্ব্যবহারে কুফল। এ ক্ষেত্রে জরুরী হচ্ছেঃ আবিস্কৃত, প্রচলিত বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে কল্যাণ বা উপকারমুখীকরণ। এ জন্য প্রয়োজন কল্যাণকর জ্ঞান চর্চা যাকে পবিত্র হাদিসে বলা হয়েছে ঈলমান নাফিয়ান-উপকারী জ্ঞান যদ্বারা মানব কল্যাণ সাধিত হয়। তাহলে আমরা সহজে আধুনিক প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করতে পারবে ইনশা আল্লাহ।
প্রযুক্তির সুফল
মোবাইল : মোবাইল বিহীন দেশ-রাষ্ট্র, জেলা-উপজেলা তো দূরের কথা মোবাইল নেই-এমন লোক পৃথিবীতো খুব কমই পাওয়া যাবে। অন্ধ ফকির-মিসকিনদের হাতেও এখন মোবাইল ফোন অতি নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তির সবচেয়ে বহুল প্রচলিত উপাদান হ’ল মোবাইল ফোন যার অপর নাম সেল ফেল। পারস্পরিক যোগাযোগ তা সুদূর হোক বা অতি কাছের হোক সব দূরত্বকে জয় করেছে যে প্রযুক্তি তা হলো মোবাইল প্রযুক্তি। যা মানুষের মাঝে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দূরত্বকে জয় করেছে।
প্রযুক্তির কুফল
মোবাইলের মাধ্যমে এখন জরুরী কথা বলা পাশাপাশি অপসংস্কৃতির প্রচার, নগ্নতাকে উসকে দেয়া, ব্লাকমেইলিং, অশ্লীল কার্যকলাপ যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোবাইল সিম কোম্পানীগুলোর লোভনীয় অফার ও এসবের অপব্যবহার তরুণ সমাজকে আরও ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসলামের আলোকে প্রযুক্তির অপব্যবহারের পরিণতিঃ
মোবাইল ফোনঃ
ভাল-মন্দ উভয় কথার সংরক্ষণকারী ফিরিশ্তার নামঃ কিরামান কাতিবীন যা মোবাইলে অবাধে চর্চা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরঅআনে মহান আল্লাহ বলেনঃمَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ- ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে’ (ক্বাফ ৫০/১৮)।
ফেইস বুক
অশ্লীলতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ أَنْ تَشِيْعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ- ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য ইহকালে ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (নূর ২৪/১৯)।
ফেইসবুকের সুফল
ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবিন (সূরাহ..আয়াত)
আমার একটি কথা হলেও তা প্রচার করে দাও (আল হাদিস)
মুহুর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআন এবং হাদিসসহ ব্যক্তিগত সুসংবাদ, শোক সংবাদসহ আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারের সহজ মাধ্যম ফেইস বুক।
ফেইসবুকের কুফল
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অন্যতম ফেইস বুক। এর অপব্যবহারে এটি নারী-পুরুষের অবৈধ যোগাযোগ, নারী-পুরুষের আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যা আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।
ইন্টারনেট প্রযুক্তির সুফল
এটা বিশ্বকে একই নেটওয়ার্কের মধ্যে এনেছে।
ইন্টারনেট তথ্য প্রযুক্তিতে রাতারাতি বিপ্লব সাধন করেছে। ইন্টারনেট নদীর মত ভূমিকায় অবতীর্ণ। নদীর এক কূল গড়ে অপর কূল যেমন ভাঙ্গে তেমনি ইন্টারনেটে যেমন রয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অচিন্তনীয় উৎস তেমন রয়েছে ব্যক্তি সত্বা বিধ্বংসী নানান উপকরণাদি। ফুলে যেমন মধুও থাকে বিষও থাকে তেমনি ইন্টারনেটে উপকারী জ্ঞান যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ক্ষতিকর জ্ঞানও। এ ক্ষেত্রে জরুরী মানব সত্বার শ্রেষ্ঠ সম্পদ বিবেক-বুদ্ধিকে ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে ব্যবহার করে এ প্রযুক্তি থেকে মধু রূপ সর্বপ্রকার কল্যাণ বের করে আনা । এক্ষেত্রে আমাদেরকে হতে হবে মৌমাছি সদৃশ যে ফুল থেকে কেবল কল্যাণকর বস্তু মধুই আহরণ করে থাকে। দুঃখের বিষয়, আমাদের এক্ষেত্রে আচরণ হচ্ছে ভ্রমরার মতো বিষ আহরণের মতই। সুতরাং, ইন্টারনেট থেকে সুফল আহরণের জন্য আমাদের অর্জিত জ্ঞান-বুদ্বি-বিবেকসম্মত উপকারী জ্ঞানের সর্বাধিক প্রয়োগ জরুরী।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অশ্লীল ভিডিও প্রচারের ফলে অশ্লীলতার ব্যাপক ছড়াছড়ি হচ্ছে। ফলে নারীর শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, ইভটিজিং, এসিড সন্ত্রাস, হত্যা-গুম ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এক জরিপে জানা যায়, বিপুল সংখ্যক স্কুল শিক্ষার্থীরা পর্ণোগ্রাফীর সাথে জড়িত। এছাড়া স্মার্ট ফোনের ওয়াইফাই শেয়ারিং (shareit, anyshare etc.) ও ব্লুটুথের (Bluetooth) মাধ্যমে এক মোবাইল থেকে অন্য মোবাইলে সহজেই তা ছড়িয়ে যাচ্ছে। পরিবারের প্রধানদের যথাযথ মনিটরিং-এর অভাবে এগুলো আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রেডিও : পরিবারের বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে বহু বছর থেকে রেডিও ও টেলিভিশন স্থান দখল করে রেখেছে। মাঝে রেডিওর অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেলেও এফ.এম রেডিও-এর মাধ্যমে এটির গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। বর্তমানে এই মাধ্যমে ইসলামিক কোন কিছুই প্রচার হয় না। এটা অনৈসলামী কার্যকলাপের অন্যতম হাতিয়ার। কোন প্রকার তার বা সেট ছাড়া মোবাইলে চালু করা যায় বলে সমাজে এর প্রভাব অনেক বেশী। এগুলোর মাধ্যমে আমাদের ভাষারও বিকৃতি হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।বাংলা+ইংরেজীর সংমিশ্রনে রক্ত দিয়ে গড়া বাংলা ভাষা এখন বাংরেজী ভাষায় পরিণত হওয়ায় বেশ কয়েক বছর আগে এ ধরণের প্রবণতা রোধ কল্পে রীট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা হাইকোর্ট থেকে রীটের অনুকূলে ডিক্রি জারী করা হয়েছিল। এতদ্বসত্ত্বেও অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি বল্লে চলে।
টেলিভিশন : এক সময় টেলিভিশন বাড়ীর চার দেয়ালের মধ্যে স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সচিত্র খবরা-খবরের তাৎক্ষণিক মাধ্যম হচ্ছে টেলিভিশন। দেশ ও জাতি বিনির্মাণে টেলিভিশনের ভূমিকা অনন্য। অপরাপর মিডিয়ার মতো এটিও অপসংস্কৃতির ভাইরাসে আক্রান্ত। বিশেষ করে বিদেশী ধারাবাহিক সিরিয়াল নাটক, থিয়েটারের মাধ্যমে অপসংস্কৃতির সয়লাবে অনেক বুনিয়াদী পরিবার আজ ছন্নছাড়া হয়ে পড়ছে। এতে জাতীয় অপরাধমূলক কর্মকান্ড দিন দিন বেড়ে চলেছে।
এই মাধ্যমে ভালো কোন ইসলামিক চ্যানেল না থাকায় এগুলোর প্রভাব আরো বেশী ত্বরান্বিত হচ্ছে।
প্রিন্ট মিডিয়া: এক সময় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন রাষ্ট্রের ৫ম স্তম্ভ হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। এ জগতও বর্তমানে নানান অপসংস্কৃতির যাঁতাকলে নিপতিত।
কোরঅআন-সুন্নাহর আলোকে আত্ম সংযম, সুস্থ সংকৃতির বিকাশের মাধ্যমে প্রিন্ট মিডিয়া জাতিকে উপহার দিতে পারে সুনাগরিক। কিন্তু, ইসলাম বিষয়ক তেমন কিছু প্রচার হয় না বললেই চলে। বরং পত্রিকা খুললেই অর্ধনগ্ন নারী-পুরুষের ছবিতে এতটাই পূর্ণ থাকে যে, এখন সংবাদপত্র পড়ার জো নেই।
বিলবোর্ড সাইনবোর্ডঃ
বাজার-ঘাট, রাস্তার আশেপাশে বিলবোর্ডও সাইনবোর্ডেও অনৈসলামিক বিষয়গুলোর প্রাধান্য চোখে পড়ে।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের গুরুত্ব :
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বত্র। এর অবদানকে যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি এটার অপব্যবহারের কথা বলে এটাকে পরিত্যাগ করারও কোন উপায় নেই। বরং আমাদেরকে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বস্ত্ততঃ প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহারই আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
সব নবী-রাসূলই তাঁদের যুগে তৎকালীন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছিলেন এবং মহান সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ তা‘আলার বিধান প্রচার-প্রসার করেছেন। উম্মতকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিখিয়েছেন। মহান আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন। সবুজ গ্রহ পৃথিবীর প্রথম নবী এবং প্রথম মানব হযরত আবুল বাশার আদম আলাইহিমুস সালাম পৃথবীতে এসেই সর্বপ্রথম যে প্রযুক্তির প্রচলন করেছিলেন তা ছিল বস্ত্র প্রযুক্তি (Textile Technology) যার সূচনা লতা-পাতা। অতঃপর কৃষি প্রযুক্তি যদ্বারা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ-পথ্য ইত্যাদির সংস্থান করা হয়েছিল। জ্ঞান চর্চার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে হযরত ইদরিস আলাইহিমুস সালামের মাধ্যমে। তিনি দ্বীনী দরসের পাশাপাশি অংক-গণিতও শিক্ষা দিতেন মর্মে জানা যায়। নবুয়তের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত দরস (শিক্ষা) দেয়ার কারণে তাঁর মূল নাম হযরত আখমুখ (Akhmukh) ইবনে মাতুশলখ (Matushlokh এর স্থলে ইদরিস (দরসদাতা) হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাদশাহ সুলায়মান আলাইহিমুস সালাম মুজিযার মাধ্যমে মহাকাশ প্রযুক্তির প্রয়োগ করে সাবার রাণী বিলকিসের সিংহাসন চোখের পলকে নিয়ে এসেছিলেন। সাইয়েদুল মুরসালিন, আশরাফুল আম্বিয়া হযরত আহামাদ মুস্তবা, মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেরা মুজিযা ছিল রাতের এক কিয়দংশের মধ্যে সাত আসমান মিরাজুন্নবীর মাধ্যমে পরিভ্রমণ যা মহাকাশ বিজ্ঞানীদের আজও হতভম্ভ করে দেয়। কারণ, বিজ্ঞানীদের মতে আইনস্টাইনের এমসি থিওরীমতে আলোর গতির চাইতে দ্রুতগতি এ জগতে দ্বিতীয়টি আর নেই। দ্বিতীয় মুজেযা চাঁদ-কে রাতারাতি আঙ্গুলের ইশারায় দ্বিখন্ডিতকরণ-যা সচক্ষে দেখেছিলেন অ্যাপোলো-১১এর নভেচারী নীল আর্মস্ট্রং ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে। সম্ভবতঃ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম Open Heart Surgery সম্পন্ন হয়েছিল অন্ততঃ চার চার বার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। ৪তম সিনা চাক হয়েছিল মিরাজুন্নবী সম্পন্নের পূর্বক্ষণে।
মূসা (আঃ)-এর সময় জাদুর প্রভাব ছিল অধিক। মূসা (আঃ) সে যুগের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ প্রদত্ত মুজেযা ব্যবহার করে ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের নিকট দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। ফলে অসংখ্য জাদুকর আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। ঈসা (আঃ)-এর সময়ে চিকিৎসাবিদ্যার প্রচলন ছিল বেশী। তিনি তাই আল্লাহ প্রদত্ত চিকিৎসাবিদ্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দাওয়াত দিয়েছেন। দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগীকে নিরাময়সহ মৃতকে আল্লাহর হুকুমে জীবিত করে দেখানোর মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করেছেন (মায়েদাহ ৫/১১০)।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের উপায় ও মাধ্যম :
বিজ্ঞানের উন্নতির এই যুগে দাওয়াতের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল্প সময়ে, অল্প কষ্টে অসংখ্য মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া যায়। আধুনিক মাধ্যমগুলোতে ইসলামের সহীহ আক্বীদার মানুষ কম আসায় এক্ষেত্রে সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন ভ্রান্ত দল ও গোষ্ঠী। তাদের থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে আধুনিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে সঠিক ইসলামকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমকে কিভাবে সঠিক পথে পরিচালনা করা যায় এবং কিভাবে ইসলাম প্রচারে ব্যবহার করা যায় তা নিচে উল্লেখ করা হ’ল।-
টেলিভিশন মিডিয়া : ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার একক হ’ল পরিবার। সেই পরিবারের অন্যতম বিনোদন মাধ্যম হ’ল টেলিভিশন। টেলিভিশনের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের গুরুত্ব অপরিসীম। এই মাধ্যমের অপব্যবহারগুলো সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি একে ইসলাম প্রচারের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিভিন্ন চ্যানেলে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করতে ইসলামী আলিম-উলামা-বুজর্গানে দ্বীনদের ইত্তেহাদ-ইত্তেফাকের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে তা সহজ হবে।
রেডিও : কম খরচে অল্প সীমানায় (range) কোন তথ্য, তত্ত্ব, উপাত্ত,আদর্শ, মতবাদ সম্প্রচার করতে চাইলে কমিউনিটি রেডিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ব্যাপারে মুসলিম বিশেষজ্ঞদের ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক উদ্যোগই পারে এ রেডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্বীন ইসলাম প্রচার করতে।
প্রিন্ট মিডিয়া : সমাজের পরিবর্তনে ও সমাজে ভালো কিছু প্রচলনের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা স্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারে প্রিন্ট মিডিয়া। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী এবং ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক বার্ষিক প্রকাশনা জাগতিক অন্যান্য প্রকাশনার তুলনা নিতান্তই অপ্রতুল বলা যায়। বললেই চলে। বিজাতীয় মতবাদ মুমিন-মুসলমানের ঈমান-আকিদায় দ্রুত প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে যা সত্যিই দুঃখজনক। উল্লেখ্য, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষিতঃ আমার একটি কথা হলেও তোমরা পৌঁছে দিবে-এই আহবান আজ মুহুর্তের মধ্যে ফেইস-বুক, ই-মেইল, গুগল, ইউটিউবে ভাইরাল করে বিশ্বব্যাপী প্রচার অতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সুযোগ আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়। তাছাড়া পর্ণোগ্রাফী মুক্ত ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে দ্বীনী-ইসলামীকরণে আমাদের দ্রুত এগিয়ে আসা জরুরী। ফেইস বুকের আদলে Aich(H)-Book, You Tube এর আদলে i.tube (Islamic Tube), i.i.net(Islamic Internet) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা ইনশা আল্লাহ সর্বপ্রকার অপসংস্কৃতি, অশ্লীলতামুক্ত ইসলামী তথ্য প্রযুক্তির বিশ্ব গড়ে তুলতে পারি। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ, এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমন্বিত ইসলামী উদ্যোগ। উম্মাহর নীতিনির্ধারণী মহল, মেধাবী, বিজ্ঞানমনস্ক এবং দ্বীনদার বিত্তবান মুসলিমদের এগিয়ে আসতে হবে।
ওয়ামা তাওফীকী ইল্লাবিল্লাহ।
কম্পিউটার : বর্তমান বিশ্বে কম্পিউটার এমন এক প্রযুক্তির নাম পৃথিবীর সবকিছুতেই যার ছোঁয়া অপরিহার্য। এর অবদান অনস্বীকার্য। পৃথিবীর সব যন্ত্রই বর্তমানে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত তথা কম্পিউটারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্যে পরিচালিত। লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চা, সাহিত্য-কলা সবকিছুতেই কম্পিউটার প্রসারিত করেছে তার সাহায্যের হাত। উন্নত বিশ্বে কৃষি, বাণিজ্য, চাকরি থেকে নিয়ে হেন কোন পেশা নেই যাতে কম্পিউটারের সাহায্য নেয়া হয় না। এই মাধ্যমকে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে অনেক সহজে ও সফলতার সাহায্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। কম্পিউটারের মাধ্যমে আজ কুরআন, হাদীছ, বিভিন্ন ইসলামী রেফারেন্স গ্রন্থ পড়া ও সংরক্ষণ করা, ভিডিও দেখা, অডিও শোনা প্রভৃতি অনেক সহজতর হয়েছে। আগে কুরআনের আয়াত বা হাদীছের ইবারত সংগ্রহ করা অনেক কঠিন ছিল। আজ তা অনেক সহজতর হয়েছে। কুরআন-হাদীস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সফটওয়্যার রয়েছে। এগুলোতে সহজেই একটি সূরাহ থেকে অন্য সূরাহতে গমন করা যায়। মুহুর্তের মধ্যে বিভিন্ন শব্দ দিয়ে বিভিন্ন আয়াত বের করা যায় । হাদীসের ক্ষেত্রেও এরকম সফটওয়্যার বিদ্যমান। বাংলা ভাষায়ও কুরআন-হাদীসের অনেক ওয়েব, সফটওয়্যার, অ্যাপ বিদ্যমান। এগুলোর যথাযথ প্রচার ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসা আমাদের কর্তব্য (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)।
উল্লেখ্য, কুরআন, হাদীছ ও ইসলামী রেফারেন্স-এর ক্ষেত্রে ‘মাকতাবা শামেলা’ সফটওয়্যার অসাধারণ। এতে বিভিন্ন বিষয়ের হাজার হাজার গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকা মওজুদ রয়েছে। আধুনিক যুগে ইসলামী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এর সঠিক ব্যবহার জানা আবশ্যক (প্রাগুক্ত)।
ওয়েব মিডিয়া : ওয়েব মিডিয়ায় মুসলমানদের অবস্থান খুব দুর্বল। বিশেষ করে নৈতিকতার চর্চা এখানে খুবই নগণ্য। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, অমুসলিম ও ইহুদীদের সাইট মুসলমানদের সাইটের তুলনায় ১২০০ গুণ বেশী। অশ্লীলতা ও নীল ছবির সয়লাব এত বেশী যে অল্প কিছু মুসলিম সাইটের অবস্থান সে তুলনায় অপ্রতুল। বাংলা ভাষায়ও ইসলামের উপর ওয়েবসাইটের সংখ্যা অতি নগণ্য। যেগুলো রয়েছে তার মানও অনেক কম। অনেক ওয়েবসাইট নিয়মিত আপডেট হয় না। ওয়েব মিডিয়ার অন্যতম উপাদান অনলাইন নিউজ-এর ক্ষেত্রে ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন পোর্টাল এর অত্যধিক অভাব পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া ইসলাম বিষয়ে বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইট প্রভৃতিরও সংখ্যা অনেক কম। এগুলোর প্রচার-প্রসারে আরো অনেক ওয়েবসাইট, ব্লগ গঠনে এগিয়ে আসার পাশাপাশি নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)।
ই-মেইল : ই-মেইলের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কাছে ইসলামের বাণী মুহূর্তেই পৌঁছানো যায়। যত বড় লেখাই হোক না কেন; তা লিখে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া যায়। ই-মেইল-এ গ্রুপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে গ্রুপ মেসেজ আদান-প্রদান করা যায়। জিমেইলের ফাইল হোস্টিং সার্ভিস গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে ফাইল সংরক্ষণ করা যায়। এমনকি বিভিন্ন ডকুমেন্টকে Ocr করে word ফরম্যাটে রূপ দেয়া যায়। (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)
ফেসবুক সহ অন্যান্য স্যোশাল মিডিয়া : স্যোশাল মিডিয়াগুলো যদিও ওয়েব মিডিয়ার অন্তর্ভুক্ত, তবুও এর গুরুত্ব ও পরিব্যাপ্তি অনেক হওয়ায় তার আলাদা আলোচনা গুরুত্বের দাবী রাখে। বর্তমানে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত এ মিডিয়া আসক্ত। এ মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার অনেক সহজ এবং অনেক দ্রুত গতিতে তা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এ মিডিয়ার সঠিক ব্যবহারের উদাহরণ অপব্যবহারের তুলনায় অনেক কম। ফেসবুকে লেখা, ছবি, ভিডিও, নোট (বড় লেখা) প্রকাশ করে দ্বীনে হকের দাওয়াতের কাজ করা যায়। এক্ষেত্রে দাওয়াতের পাশাপাশি অনৈসলামী মতবাদকে খন্ডনও করা যায়। তবে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৌজন্য, শালীনতা, মাধুর্যতা বজায় রাখা আবশ্যক। সবসময় বিরোধিতামূলক বা খন্ডনমূলক প্রচার নয়, বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দাওয়াত দেওয়া অনেক বেশী কার্যকর। দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইসলামী মূলনীতি অনুসরণ করে সঠিক তথ্য-প্রমাণসহ আলোচনা দাওয়াতকে বেগবান করবে বলে আশা করা যায়। এছাড়াও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া যেমন টুইটার, বেশতো, উম্মাহল্যান্ড, লিংকডইন, গুগল প্লাস, ইন্সট্রাগ্রামেও ইসলাম বিষয় লেখা, ছবি পোস্ট করা সময়ের দাবী। (প্রাগুক্ত)
ইউটিউব : মানব মনে দাগ কাটার ক্ষেত্রে দেখা ও শোনার প্রভাব বেশী। এজন্যই মাল্টিমিডিয়ার প্রয়োগ অনেক বেশী প্রয়োজন। ভিডিও প্রকাশ করে তা প্রচার করলে দাওয়াতের প্রসার অনেক বৃদ্ধি পায়। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, তাফসীর, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ইসলামী হামদ, না‘ত প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এসব রেকর্ড করে ইউটিউব, ডেইলীমোশন, ভিমিও প্রভৃতি সাইটে আপলোড করে প্রচার করা যেতে পারে। বড় বড় ভিডিওর তুলনায় ছোট ছোট প্রশ্নোত্তর বা ভিডিওর প্রভাব অনেক বেশী। শিশুদের আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য অনুমোদনযোগ্য কার্টুনও প্রকাশ করা যেতে পারে। এছাড়া শিশুদের জন্য ছড়া, বিভিন্ন ইসলামী গল্প কথকের মাধ্যমে ভিডিও করে প্রকাশ করলে তা শিশুদের মনোজগতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে(তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)। ।
মোবাইল : মোবাইল এখন শুধু দূর-আলাপনী যন্ত্রই নয়, এটি এখন মিনি কম্পিউটারের রূপ ধারণ করেছে। ফলে এর বহুমুখী ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মোবাইল সঠিকভাবে ব্যবহার করে এটিকে দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা যায়। বিশেষ করে স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে ইসলামের অনেক বিষয় জানা, মেনে চলা সুবিধাজনক (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)। ।
স্মার্টফোন
স্মার্টফোনের মাধ্যমে বর্তমানে অনেক সহজেই কুরআন-হাদীছের বাণীগুলো পড়া ও সার্চ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কুরআন ও হাদীছের এই সংকলনগুলো বাংলায় সহজলভ্য। এখন সহজেই সালাতের সময়সূচী, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত প্রভৃতি জানা যায়। স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইসলামী লেকচার, গান, টিউটোরিয়াল-এর অডিও-ভিডিও শোনা ও দেখা যায়। একটি মাত্র ছোট্ট মেমোরীতে অসংখ্য বক্তব্য ধারণ করা যায়। সেই সাথে অতি সহজেই তা অন্যের কাছে পৌঁছিয়ে প্রচার করা যায়(তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)। ।
অ্যান্ড্রয়েড ফোন
অ্যান্ড্রয়েড ফোনের অ্যাপগুলোর মাধ্যমে ইসলাম চর্চা অনেক সহজ হয়েছে। ইসলাম বিষয়ক অ্যাপগুলোতে কুরআনের বিভিন্ন অনুবাদ, হাদীছের গ্রন্থ, ফাতাওয়ার কিতাব, সালাতের সময়সূচী, দৈনন্দিন জীবনের দো‘আ, তাফসীর, মাসআলা-মাসায়েল প্রভৃতি বিষয় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষায় হিসনুল মুসলিম অ্যাপ, হাদীসবিডি অ্যাপ, আই হাদীস, বাংলা কুরআন প্রো প্রভৃতি অন্যতম। এসবের মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞানার্জন করা সহজ হয়েছে। বিভিন্ন কাজের ফাঁকে, ভ্রমণে ও অবসর সময়ে এক ক্লিকেই এসব পড়া যায়। শুধু পড়াই নয়, অডিও ডাউনলোডের মাধ্যমে বিখ্যাত ক্বারীদের তেলাওয়াত শুনা এখন অনেক সহজ হয়েছে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মাধ্যমে পিডিএফ, ইপাব, মোবি প্রভৃতি বিভিন্ন ফরম্যাটের পিডিএফ পড়া যায়। ইসলামের অসংখ্য বিষয়ে বর্তমানে পিডিএফ বিদ্যমান। হাতের কাছেই এসব রয়েছে, অথচ এসব উপকারী বিষয়কে পরিত্যাগ করে আমরা শয়তানী ওয়াসওয়াসায় পড়ে অনৈসলামিক বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছি। ইসলামী বিষয়গুলো অন্যের মাঝে প্রচলনের জন্যে আমাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এসব ধর্মীয় বই, অডিও, ভিডিও লেকচারগুলো অন্যের মাঝে বিভিন্ন মাধ্যমে (shareit, bluetooth, anyshare) প্রচার করা যায়। এসব সিডি বা ডিভিডিতে কপি করেও প্রচার করা যায়।
(তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)। ।
বিজ্ঞাপন : বর্তমানে সব কিছুর বিজ্ঞাপনেই নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন কোন বিজ্ঞাপনে অশ্লীল ছবিও ব্যবহার করা হয়। রাস্তায় বা বাজারে এসব বিলবোর্ডের ব্যবহার আমাদের ইসলামী সংস্কৃতির বিরোধী। এর বিরুদ্ধে আমাদের তেমন পদক্ষেপ নেই।
এক্ষেত্রে ইসলামী কথা সম্বলিত বিলবোর্ড ভাড়া করে বা নিজের বাসাবাড়ীতে অল্প খরচেই স্থাপন করা যেতে পারে। প্রিন্ট মিডিয়াতেও বিজ্ঞাপন হিসাবে ইসলামী মূলনীতির কথাগুলো প্রকাশ করা যেতে পারে। রাস্তার পাশে বা মোড়ে মোড়ে ইসলামের সুমহান বাণী সম্বলিত বিজ্ঞাপন স্থাপন করলে তা দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখতে পারে। সারাদেশে অসংখ্য মাদরাসা রাস্তার পাশে বিদ্যমান। এগুলোর পাশের রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন ইসলামী বাণীর ব্যানার, বিলবোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে। ‘মুসলিম ও কুফরীর মাঝে পার্থক্য হ’ল ছালাত’,[1] ‘একটি আয়াত হ’লেও আমার পক্ষ থেকে প্রচার কর’,[2] ‘মুমিনদের মধ্যেই সেই উত্তম যে স্ত্রীর কাছে উত্তম’[3] প্রভৃতি বাণী সম্বলিত বিলবোর্ড রাস্তায় স্থাপন করা যায়। এছাড়া রাস্তায় রাস্তায় সফরের দো‘আ ও সফরকে উৎসাহিত করার আয়াতগুলো বিলবোর্ডে লেখা যেতে পারে। অশ্লীলতার পরিণাম সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীছগুলো উল্লেখ করে বাজারে বিলবোর্ড স্থাপন করা যায়। এছাড়া স্টীকার, লিফলেট প্রভৃতি মসজিদের দেয়ালে, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে প্রভৃতিতে স্থাপন করে দ্বীনী দাওয়াত প্রচার করা যেতে পারে (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট)।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে আলেমদের ভূমিকা :
তথ্য ও প্রযুক্তি মানুষের জীবন ও তার উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মানুষের জীবন প্রবাহকে বেগবান করেছে। আর ইসলাম মানুষের জন্য যে কোন কল্যাণকর জিনিসের সঠিক ব্যবহার অনুমোদন করে। তাই তথ্য ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে ইসলামের কোন আপত্তি নেই। তথ্য ও প্রযুক্তির ভুল ব্যবহার হচ্ছে। কোন জিনিসের ভুল ব্যবহার হ’লে তা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। বরং ভুল ব্যবহার বন্ধ করতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের দায়িত্ব মানুষকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তার জবাব আলেমদের পক্ষ থেকেই আসা উচিত। ইসলামের নামে অসংখ্য নতুন নতুন ফিৎনা, বিভ্রান্ত মতবাদের প্রতিবাদ ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে প্রচার করার দায়িত্ব আলেম সমাজের উপরই বর্তায়। সাপ্তাহিক জুম‘আর খুৎবায় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে কি করণীয় সে সম্পর্কে আলোচনা করা যরূরী। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তি যতটা তৎপর, অধিকতর ঈমানের অধিকারী আলেম সমাজ তার চেয়ে বেশী তৎপর হবেন এটা আমাদের একান্ত কামনা। ইসলামের সঠিক দিক বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরার জন্য ইন্টারনেট, টিভি, ইলেক্ট্রনিক ও অন্যান্য মিডিয়া ব্যবহার করা নাজায়েয বলে ঘোষণা করা ‘মাথা ব্যথা হ’লে মাথা কেটে ফেলার’ নামান্তর।
প্রযুক্তির সহজ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে ইসলাম বিরোধীরা অনলাইনে নির্জলা মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতাকে উসকে দিচ্ছে। নাস্তিকতার প্রচার ও ধর্মে অযথা অবিশ্বাস তৈরি করছে। আধুনিক জাহেলিয়াতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ইসলামের প্রকৃত বার্তা মানুষের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব আলেম সমাজের। মানবজীবনের জন্য অতীব যরূরী আমলগুলো তথ্যসূত্রসহ তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামের বাস্তব অনুশীলনের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা যেতে পারে।
আরবের আলেমরা ফেসবুক ব্যবহার করে ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। লাখ লাখ মানুষ তাদের পেইজে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো পাঠ করছে।
আল্লাহ বলেন,إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِيْنَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً- ‘আমি পৃথিবীর সবকিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি, যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে’ (কাহফ ১৮/৭)।
উপসংহারঃ তোমারা একটি উত্তম জাতি। মানব জাতি থেকে তোমাদের বাছাই করা হয়েছে (এ উদ্দেশ্যে যে) লোকদেরকে সৎ কাজের উপদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে এবং তোমরা নিজেরাও সৎ কাজ করবেন।
এমন কথা বলো না, যা তোমরা করো না। এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মুমিন-মুসলিমদেরকে এ শর্তে মহান আল্লাহ তায়া'লার সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত (অনুসারী) করা হয়েছে এ শর্তে যে, নিজেরা সৎ কাজ (অআমলে স্বলিহা) করবে, অসৎ কাজ হতে বিরত থেকে অপরাপর মানুষ-কেও সৎ কাজের অআদেশ এবং অসৎ কাজ হতে বিরত রাখবে। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণকর দিকে নিজ উৎসাহিত হওয়া এবং অপরকে উৎসাহিত করা প্রচার এবং অকল্যাণকর দিক নিজেও নিরুৎসাহিত হওয়া এবং অপরকেও নিরুৎসাহিতকরণে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে এসে শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং শ্রেষ্ঠ উম্মাত হিসাবে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আত্ম প্রতিষ্ঠা করা।
ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।– আ--মীন! ইয়া রব্বাল আ'লামীন।
[1]. মুসলিম হা/৮২; মিশকাত হা/৫৬৯।
[2]. বুখারী হা/৩৪৬১; মিশকাত হা/১৯৮।
[3]. তিরমিযী হা/৩৮৯৫; মিশকাত হা/৩২৫২, হাদীছ ছহীহ।
মহাবিশ্ব
(সৌজন্যেঃ উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ)
স্থান ও সময় এবং এদের অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয় নিয়েই মহাবিশ্ব ।[১][২][৩][৪]
পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ , সূর্য ও অন্যান্য তারা ও নক্ষত্র , জ্যোতির্বলয়স্থ স্থান ও এদের অন্তর্বর্তীস্থ গুপ্ত পদার্থ , ল্যামডা-সিডিএম নকশা , তমোশক্তি ও শূণ্যস্থান (মহাকাশ) - যেগুলো এখনও তাত্ত্বিকভাবে অভিজ্ঞাত কিন্তু সরাসরি পর্যবেক্ষিত নয় - এমন সব পদার্থ ও শক্তি মিলে যে জগৎ তাকেই বলা হচ্ছে মহাবিশ্ব ।
আমাদের পর্যবেক্ষণ-লব্ধ মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ২৮ বিলিয়ন parsec (৯১ বিলিয়ন light-year)[৫] । পুরো বিশ্বের আকার অজানা হলেও এর উপাদান ও সৃষ্টিধারা নিয়ে বেশ কয়েকটি hypotheses বিদ্যমান । [৬] মহাবিশ্বের উৎপত্তি সংক্রান্ত বিষয়কে বলে বিশ্বতত্ত্ব। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সুদূরতম প্রান্তের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন তাত্ত্বিক গবেষণায় মনে হয় মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রক্রিয়াই তার সৃষ্টি থেকেই একই ধরণের প্রাকৃতিক নিয়ম ও কয়েকটি নির্দিষ্ট ধ্রুবক দ্বারা নির্ধারিত হয়। বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্ব অনুসারে এর আয়তন ক্রমবর্ধমান। সম্প্রতি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন তত্ত্বে আমাদের এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পাশাপাশি আরো অনেক মহাবিশ্ব থাকার অর্থাৎ অনন্ত মহাবিশ্ব থাকার সম্ভাবনা অবশ্যম্ভাবী বলে ধারণা করা হচ্ছে। পবিত্র ইসলাম মতে, আল্লাহপাকের সৃষ্টি সত্বায় অন্ততঃ সাত সাতটি মহাকাশ বিদ্যমান যা একটির চেয়ে অপরটি তুলনামূলকভাবে অকল্পনীয়ভাবে বড়।
মহাবিশ্বের ইতিহাস
প্রাচীন কালে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য নানাবিধ বিশ্বতত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া হত। পুরাতন গ্রিক দার্শনিকরাই প্রথম এই ধরণের তত্ত্বে গাণিতিক মডেলের সাহায্য নেন এবং পৃথিবী কেন্দ্রিক একটি মহাবিশ্বের ধারণা প্রণয়ন করেন। তাঁদের মডেলে পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত।
উল্লেখ্য, বিশ্বতত্ত্বের ইসলামী ধারণামতে, পবিত্র ক্বাবা পৃথিবীর মধ্যস্থলে অবস্থিত (দেখুনঃ বিশ্বমানচিত্র)। অাবার পবিত্র ক্বাবার ঠিক বরাবর উর্ধ্বজগতে অবস্থিত সাত অাসমানে বায়তুল মামুর বিদ্যমান।
উদাহরণস্বরূপ, একটি পাথরকে যদি সপ্তাকাশে অবস্থিত বায়তুল মামুর থেকে ফেলে দেয়া হলে যত বছরই লাগুক না কেন, একদিন না একদিন ঠিক নিম্নজগতে অবস্থিত পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত মক্বা মুয়াজ্জিমার খানায়ে ক্বাবা বা বায়তুল্লাহ-তে গিয়ে পড়বে।
নিউটনের গতি ও মহাকর্ষ সংক্রান্ত গভীর ধারণা পর্যবেক্ষণের সাথে সৌরকেন্দ্রিক জগতের সামঞ্জস্য নির্ধারণ করে। ধীরে ধীরে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করেন সূর্যের মতই কোটি কোটি তারা দিয়ে একটি গ্যালাক্সি গঠিত। কয়েক শত বছর বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল সমগ্র মহাবিশ্ব মানে শুধুমাত্র আমাদের এই ছায়াপথ গ্যালাক্সিটিই। ১৯২০র দশকে উন্নত দুরবীনের কল্যাণে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করলেন ছায়াপথের বাইরে অন্য গ্যালাক্সিদের। [৭][৮]
বিজ্ঞানীদের ধারণা হল সুদূর অতীতে সমস্ত গ্যালাক্সিগুলি বা তাদের অন্তর্নিহিত সমস্ত পদার্থই একসাথে খুব ঘন অবস্থায় ছিল এবং কোন মহা বিস্ফোরণের ফলে বস্তুসমূহ একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিস্ফোরণের নাম দেওয়া হল বিগ ব্যাং। ১৯৬০এর দশকে বিজ্ঞানীরা বিগ ব্যাংএ সৃষ্ট উষ্ণ বিকিরণের শীতল অবশেষের সন্ধান পেলেন।[১০] এই তরঙ্গ বিগ ব্যাং ঘটনার প্রায় ৪০০,০০০ বা চার লক্ষ বছর পরে, বস্তু ঘনত্বের হ্রাসের পর, মুক্ত হয়েছিল। এই মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ মহাবিশ্বের প্রতিটি জায়গাতেই পাওয়া যায়।
মহাবিশ্বের উপাদান সমূহ
মহাবিশ্বের আকার বিশাল। বর্তমান বিশ্বতত্ত্বের মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বর্তমান বয়েস ১৩.৭৫ বিলিয়ন বা ১,৩৭৫ কোটি বছর। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান অংশের "এই মুহূর্তের" ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোক বছর। মহাবিশ্বের ব্যাস ১৩.৭৫ x ২ = ২৭.৫০ বিলিয়ন আলোক বছরের চাইতে বেশী। তাছাড়া, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বকে যদি একটা গোলক কল্পনা করা হয় তবে তার ব্যাসার্ধ হবে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোক বর্ষ। যদিও সেই দূরত্বে অবস্থিত গ্যালাক্সি থেকে এই মুহূর্তে যে বিকিরণ বের হচ্ছে তা আমরা কখনই দেখতে পাব না।
জ্যোতির্বিদরা মনে করছেন দৃশ্যমান মহাবিশ্বে প্রায় ১০০ বিলিয়ন (১০+১১) গ্যালাক্সি আছে। এই গ্যালাক্সিরা খুব ছোটও হতে পারে, যেমন মাত্র ১০ মিলিয়ন (বা ১ কোটি) তারা সম্বলিত বামন গ্যালাক্সি অথবা খুব বড়ও হতে পারে, যেমনঃ দৈত্যাকার গ্যালাক্সিগুলিতে ১০০০ বিলিয়ন তারা থাকতে পারে (আমাদের গ্যালাক্সি ছায়াপথের ১০ গুণ বেশী)। দৃশ্যমান মহাবিশ্বে আনুমানিক ৩ x ১০+২৩টি তারা থাকতে পারে।[১৩]
মহাবিশ্বের সংঙ্গে আমাদের পরিচয় দৃশ্যমান বস্তুর আঙ্গিকে। পরমাণু ও পরমাণু দ্বারা গঠিত যৌগ পদার্থ দিয়ে এই দৃশ্যমান বিশ্ব গঠিত। পরমাণুর কেন্দ্রে নিউক্লিয়াস প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত। প্রোটন ও নিউট্রনকে ব্যারিয়ন বলা হয়। ব্যারিয়ন তিনটি কোয়ার্ক কণা দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে দুটি কোয়ার্ক কণা দিয়ে গঠিত কণাদের মেজন বলা হয়। অন্যদিকে লেপটন কণা কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত নয়। সবেচেয়ে পরিচিত লেপটন কণা হচ্ছে ইলেকট্রন। প্রমিত মডেল বা স্ট্যান্ডার্ড মডেল কোয়ার্ক, লেপটন ও বিভিন্ন বলের মিথষ্ক্রিয়ায় সাহায্যকারী কণাসমূহ (যেমন ফোটন, বোজন ও গ্লুয়োন) দিয়ে তৈরি। বর্তমানের কণা পদার্থবিদ্যাকে ব্যাখ্যা করতে এই মডেল সফল হয়েছে।
মহাবিশ্বের গঠন ও আকার
সূর্য আমাদের নিকটবর্তী নক্ষত্র। সূর্য থেকে আলো আসতে ৮ মিনিট মত সময় লাগে, কাজেই সূর্যের দূরত্ত্ব হচ্ছে আনুমানিক ৮ আলোক মিনিট। আমাদের সৌর জগতের আকার হচ্ছে ১০ আলোক ঘন্টার মত। সূর্যের পরে আমাদের নিকটবর্তী তারা হচ্ছে ৪ আলোক বর্ষ দূরত্বে। নিচের চিত্রে ১৪ আলোক বর্ষের মধ্যে অবস্থিত সমস্ত তারাদের দেখানো হয়েছে।
আমাদের ১৪ আলোকবর্ষের মধ্যে যে সমস্ত তারা আছে
আমাদের গ্যালাক্সি ছায়াপথ
নিচের ছবিতে ছায়াপথ গ্যালাক্সির বাহুসমূহ দেখানো হয়েছে। সূর্য থেকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৩০,০০০ আলোক বর্ষ। গ্যালাক্সির ব্যাস ১০০,০০০ বা এক লক্ষ আলোক বর্ষ। কেন্দ্রের উল্টোদিকের অংশকে আমরা দেখতে পাই না।
আমাদের গ্যালাক্সির সর্পিল বাহুসমূহ
স্থানীয় গ্যালাক্সিপুঞ্জ
নিচের চিত্রে ছায়াপথের ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত গ্যালাক্সিগুলো দেখানো হয়েছে। এই স্থানীয় গ্যালাক্সি দলের মধ্যে বড় তিনটি সর্পিল গ্যালাক্সি - ছায়াপথ, অ্যান্ড্রোমিডা বা M31 এবং M33 একটি মহাকর্ষীয় ত্রিভুজ তৈরি করেছে। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি আমাদের নিকটবর্তী বড় গ্যালাক্সি। এর দূরত্ব হচ্ছে ২.৫ মিলিয়ন বা ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। স্থানীয় দলের মধ্যে বেশীর ভাগ গ্যালাক্সিই বড় ম্যাজিল্লান মেঘের মত অনিয়মিত গ্যালাক্সি।
স্থানীয় গ্যালাক্সিপুঞ্জ
স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জ
ডান দিকের চিত্রে স্থানীয় গ্যালাক্সি দল থেকে স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জের অন্যান্য দলের দূরত্ত্ব দেখানো হয়েছে। এই মহাপুঞ্জের কেন্দ্র কন্যা গ্যালাক্সি দল হওয়াতে তাকে কন্যা মহাপুঞ্জ বা মহাদল বলা হয়। কন্যা গ্যালাক্সি পুঞ্জ আমাদের থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বা ৬.৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই ধরণের মহাপুঞ্জগুলো ফিতার আকারের মত। সাবানের বুদবুদ দিয়ে এই ধরণের গ্যালাক্সিপুঞ্জ গঠনের মডেল করা যায়। দুটো বুদবুদের দেওয়াল যেখানে মেশে সেখানেই যেন গ্যালাক্সির ফিতা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জ বা সুপারক্লাস্টার।
নিচের চিত্রে আমাদের ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত প্রধান গ্যালাক্সিপুঞ্জ ও গ্যালাক্সি দেওয়াল দেখানো হচ্ছে। এই চিত্রে বুদবুদগুলোর মাঝের শূন্যতা (void) খুব ভাল করেই বোঝা যাচ্ছে। কন্যা গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জসহ ৫০ মেগাপার্সেকের (৫০ মিলিয়ন পার্সেক বা ১৬৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ)মধ্যে সমস্ত পদার্থ ৬৫ মেগাপার্সেক দূরের নর্মা পুঞ্জের (Abell 3627)দিকে ৬০০ কিমি/সেকেন্ডে ছুটে যাচ্ছে। বৃহত্তর স্কেলে গ্যালাক্সি সৃষ্টির জন্য ব্যারিয়ন ধ্বনি স্পন্দন (Baryon Acoustic Oscillation) যথেষ্ট সফল হয়েছে। এই মডেল অনুযায়ী গ্যালাক্সি পুঞ্জ মোটামুটি ১০০ মেগাপার্সেক (~৩০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ)স্কেলে বা স্থান জুড়ে সৃষ্টি হবে। স্লোয়ান ডিজিটাল স্কাই সার্ভের ডাটাতে ব্যারিয়ন স্পন্দন ২০০৫-এ ধরা পড়ে।
।
মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনে আরো একধাপ
মহাজাগতিক ঘর্ষণ বা বিগ ব্যাং-এর পরে মহাকাশ থেকে মাধ্যাকর্ষণের যে তরঙ্গ প্রবাহিত হয়, প্রথমবারের মতো তা আবিষ্কৃত হয়েছে৷ এর থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক অজানা রহস্যের সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা৷
মহাজাগতিক ঘর্ষণ বা বিগ ব্যাং ঠিক কত বছর আগে হয়েছিল, অর্থাৎ মহাবিশ্বের সৃষ্টি ঠিক কত কোটি বছর আগে – এটা নিয়ে আছে নানা জল্পনা-কল্পনা৷ সোমবার হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টারের জ্যাতির্পদার্থবিদরা জানান, যে তরঙ্গ প্রবাহের সন্ধান তাঁরা পেয়েছেন, তা একটি মাইল ফলক৷
১৪শ' কোটি বছর আগে এই তরঙ্গের উৎপত্তি হয়েছিল বলে জানান তাঁরা৷ এর সাথে আলবার্ট আইনস্টাইনের এক শতকের পুরোনো আপেক্ষিক তত্ত্বের মিল পাওয়া যায়৷ এ থেকে এই প্রথম ‘কসমিক ইনফ্লেশন' বা মহাজাগতিক স্ফীতির সরাসরি তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেল৷ শুধু তাই নয়৷ এই তত্ত্ব থেকে এ কথা সহজেই বলা যায় যে, মহাবিশ্ব ‘চোখের পলক ফেলার সময়ে' একশ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বিস্তার লাভ করেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন